এপস্টেইন কী রুশ গুপ্তচর ছিলেন, তদন্তে পোল্যান্ড

ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাককে লেখা এক ইমেইলে এপস্টেইন দাবি করেন, পুতিন তার সঙ্গে বৈঠক করতে চেয়েছিলেন, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এপস্টেইন–সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ নথিতে দেখা গেছে, সেখানে পুতিনের নাম এসেছে ১ হাজার ৫৬ বার এবং মস্কোর উল্লেখ প্রায় ১০ হাজার। নথির বিভিন্ন অংশে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এপস্টেইন ও তার সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল যেসব ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করতেন, তার সঙ্গে রুশ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি ব্ল্যাকমেইলের জন্য ‘কমপ্রোম্যাট’ সংগ্রহ করার পদ্ধতি মিলে যায়।

জেফ্রি এপস্টেইন রাশিয়ার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন কি না তা তদন্ত শুরু করেছে পোল্যান্ড। অভিযোগ ওঠেছে, এপস্টেইন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পর্কে আপত্তিকর তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে রুশ পক্ষ থেকে অর্থ পেতেন। পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বলেন, এপস্টেইন সম্পর্কিত নথিতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নাম বারবার ওঠে আসা এবং অন্যান্য রুশ-সম্পর্কিত ইঙ্গিত পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হচ্ছে। খবর দ্য টাইমস।

মার্কিন বিচার বিভাগের প্রকাশিত এপস্টেইন–সংশ্লিষ্ট বিপুল পরিমাণ নথিতে দেখা গেছে, রাজনীতি, ব্যবসা ও একাডেমিয়ার বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার সংযোগ ছিল; সেখানে পুতিনের নাম এসেছে ১ হাজার ৫৬ বার এবং মস্কোর উল্লেখ প্রায় ১০ হাজার। নথির বিভিন্ন অংশে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এপস্টেইন ও তার সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল যেসব ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করতেন, তা রুশ নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবি যেভাবে ব্ল্যাকমেইলের জন্য ‘কমপ্রোম্যাট’ সংগ্রহ করে, তার সঙ্গে মিল রয়েছে।

টাস্ক বলেন, ‘বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে এবং বিভিন্ন সূত্রে এখন ব্যাপকভাবে সন্দেহ দেখা যাচ্ছে যে, এই নজিরবিহীন পেডোফাইল কেলেঙ্কারি রুশ গোয়েন্দাদের সহায়তায় সংগঠিত হয়েছিল। এটি যদি সত্য হয়, তবে পোল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এর তাৎপর্য অত্যন্ত গুরুতর।' তিনি আরো বলেন, যদি রুশ গোয়েন্দারা এপস্টেইন–সম্পর্কিত অপারেশনে জড়িত থাকে, তবে তারা এখনো সক্রিয় অনেক বিশ্বনেতার বিরুদ্ধেই আপত্তিকর তথ্য রাখে।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা গত ডিসেম্বরে বলেন, এপস্টেইন কেলেঙ্কারি পশ্চিমা অভিজাতদের ভণ্ডামি প্রকাশ করেছে। তিনি টেলিগ্রামে লিখেন, এখানে ছিলেন সেই সব পশ্চিমা ‘নৈতিক শিক্ষকেরা’, যারা রাশিয়াকে মানবাধিকার শেখাতেন, অথচ নিজেরাই ‘আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে আকর্ষণীয় সঙ্গীদের সঙ্গে’ সময় কাটাতেন।

এপস্টেইন–সংশ্লিষ্ট নথিতে রুশ প্রভাবের আরো ইঙ্গিত পাওয়া যায় ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন–উইন্ডসরকে ঘিরে। এক নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইন ২০১০ সালে তাকে ‘ইরিনা’ নামে ২৬ বছর বয়সী এক ‘সুন্দরী রুশ নারী’র সঙ্গে ডিনারের প্রস্তাব পাঠান। এক নাবালিকার সঙ্গে অ্যান্ড্রুর দেহব্যবসা সংক্রান্ত দণ্ডের দু’ বছর পরের ঘটনা এটি। অন্য নথিতে দেখা যায়, এপস্টেইন বিল গেটস সম্পর্কে দাবি করেছিলেন যে, তিনি ‘রুশ মেয়েদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক থেকে’ যৌনসংক্রমিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে গেটস দৃঢ়ভাবে এ দাবি অস্বীকার করেছেন।

২০১০ সালের নভেম্বরের এক ইমেইলে এপস্টেইন এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করেন, তার রুশ ভিসা প্রয়োজন কিনা। আবার ২০১১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের এক ইমেইলে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি জানান, এপস্টেইন রাশিয়া সফরের সময় পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করেছিলেন। ইমেইলে লেখা ছিল, ‘ইগরের সঙ্গে কথা বলেছি। তিনি বললেন, আপনি পাম বিচে শেষবার দেখা হলে বলেছিলেন ১৬ সেপ্টেম্বর পুতিনের সঙ্গে আপনার বৈঠক রয়েছে।' তবে পুতিনের সঙ্গে এপস্টেইনের কোনো সাক্ষাতের কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।

২০১৩ সালের মে মাসে এপস্টেইন ইউরোপ কাউন্সিলের মহাসচিব থোরবিয়র্ন ইয়াগল্যান্ডকে ইমেইলে জানান যে, তিনি পুতিন ও রাশিয়াকে 'আর্থিক ব্যবস্থা পুনর্গঠনে' সহায়তা করতে চান। একই মাসে তিনি ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাককে লেখা এক ইমেইলে দাবি করেন, পুতিন তার সঙ্গে বৈঠক করতে চেয়েছিলেন, যা এপস্টেইন প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘পুতিন আমাকে সেন্ট পিটার্সবার্গে ডেকেছিলেন, কিন্তু আমি না করেছি। দেখা করতে হলে তাকে সত্যিকারের সময় ও ব্যক্তিগত পরিবেশ দিতে হবে।'

২০১৪ সালের আরেক ইমেইলে দেখা যায়, রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠকের চেষ্টা করা হচ্ছিল; জাপানি উদ্যোক্তা জোয়ি ইতো লিখেন যে, তিনি লিঙ্কডইন সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যানকে এপস্টেইনের সঙ্গে পুতিনের দেখা করার ব্যাপারে রাজি করাতে পারেননি। আরেক ইমেইলে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ২০১৪ সালের সেই সম্ভাব্য বৈঠক বাতিল হয় ইউক্রেনে রুশ বাহিনী এমএইচ১৭ ফ্লাইট ভূপাতিত করার পর। ২০১৮ সালে এপস্টেইন স্টিভ ব্যাননকে ইমেইলে জানান, রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ এবং ইয়াগল্যান্ডের এক বৈঠক নিয়ে তার আগ্রহের কথা। এপস্টেইন আরো দাবি করেন, তিনি রাশিয়ার সাবেক জাতিসংঘ রাষ্ট্রদূত ভিটালি চুরকিনকে ট্রাম্পকে 'বুঝতে' সহায়তা করেছিলেন। চুরকিন ২০১৭ সালে মারা যান।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই–৬ এর রুশ ডেস্কের সাবেক প্রধান ক্রিস্টোফার স্টিল টাইমস রেডিওকে বলেন, এপস্টেইনের মস্কোর হয়ে ‘কমপ্রোম্যাট’ সংগ্রহের সম্ভাবনা খুবই প্রবল। তিনি ধারণা করেন, এ সংযোগের সূত্র হতে পারে গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বাবা রবার্ট ম্যাক্সওয়েল। স্টিল বলেন, তার আমেরিকান সূত্র জানিয়েছে, ১৯৭০-এর দশকেই এপস্টেইন নিউ ইয়র্কের ব্রাইটন বিচে রুশ সংগঠিত অপরাধচক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাদের মাধ্যমে নিউ ইয়র্কে রুশ মিশনের সঙ্গে সংযোগ গড়ে ওঠে। তিনি আরো বলেন, ১৯৮০-এর দশকে রবার্ট ম্যাক্সওয়েলের মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ইহুদি নাগরিকদের বের করে আনা এবং পশ্চিমা দেশে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির অর্থ বিনিয়োগের চুক্তির সময় এপস্টেইনের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ মূলধন সোভিয়েত উৎস থেকেই এসেছে বলে ধারণা করা যায়। স্টিলের ভাষায়, ‘সম্ভবত তার বিনিয়োগের বড় অংশ, যার উৎস কখনোই পরিষ্কার করা হয়নি, সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকেই এসেছিল।'

আরও