বণিক বার্তা এক্সপ্লেইনার

যুদ্ধ থামলেও হরমুজে এখনো স্বস্তি ফেরেনি কেন?

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করতেই অন্তত মাস দুয়েক লাগতে পারে।

তেলের দামও দ্রুত কমে গেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। হরমুজ প্রণালি খুললেও সমুদ্রপথে এখনো সেই স্বাভাবিক চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক সমঝোতা হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ আবার আগের মতো স্বাভাবিক হয়ে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেছিলেন, 'এবার জাহাজ চলুক, তেল প্রবাহ শুরু হোক।' এদিকে তেলের দামও দ্রুত কমে গেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। হরমুজ প্রণালি খুললেও সমুদ্রপথে এখনো সেই স্বাভাবিক চিত্র দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু কেন?

তেহরানে প্রদর্শিত একটি ব্যানারে হরমুজ প্রণালি বন্ধের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে

পথ খুললেও জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়নি

যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করত। এর প্রায় অর্ধেকই ছিল তেলবাহী ট্যাংকার, যেগুলো প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করত। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। পালটা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে।

এদিকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও চার দিনে এখন পর্যন্ত মাত্র ৭টি জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করেছে। প্রণালির দুই পাশে এখনো ৫৫০টিরও বেশি জাহাজ আটকে আছে।

যুদ্ধ শেষ হলেও ভয় এখনো কাটেনি

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিকদের মতে, শুধু প্রণালি খুলে দিলেই যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বিষয়টি এমন নয়। যুদ্ধের সময় বহু কারখানা তাদের উৎপাদন কমিয়েছে, বন্দরের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সংরক্ষণ সক্ষমতার সংকটে সরবরাহ ব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। ফলে আগের অবস্থায় ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর মধ্যে একটি হলো সমুদ্রে পাতা মাইন। যুদ্ধের সময় ইরান হরমুজে মাইন পেতে পারে বলে সতর্ক করেছিল। পরে তারা বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও নিরাপদ চলাচলের যে রুট প্রকাশ করেছে, সেখানে সম্ভাব্য মাইন এড়িয়ে চলার কথাও উল্লেখ ছিল।

সম্ভাব্য মাইন এড়িয়ে চলার রুট

যুক্তরাষ্ট্রও দাবি করেছে, সংঘাতের সময় তারা ইরানের মাইন বসানোর নৌযান লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাইনমুক্ত পথ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনেক জাহাজ মালিক ঝুঁকি নিতে রাজি নন।

বিশ্লেষকদের ধারণা, নিরাপদ নৌপথ নিশ্চিত করতেই অন্তত মাস দুয়েক লাগতে পারে।

নতুন বিতর্ক, চলাচলে কি ফি দিতে হবে?

আরেকটি বড় প্রশ্ন উঠেছে চলাচলের ফি নিয়ে। এতদিন হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতে কোনো অর্থ দিতে হতো না। তবে যুদ্ধ শুরুর পর ইরান জানিয়েছে, নিরাপদ চলাচলের সমন্বয় করার জন্য তারা নির্দিষ্ট ফি চার্জ করতে পারে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলো এর বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, এটি কার্যত নৌ চলাচলের স্বাধীনতায় বাধা।

তবে ইরানের দাবি, এটি টোল নয়, বরং নিরাপত্তা সেবার বিনিময়ে নেয়া অর্থ। ভবিষ্যতে এই ইস্যু নিয়েও নতুন কূটনৈতিক টানাপড়েনের আশঙ্কা রয়েছে।

বীমা খরচ এখনো অস্বাভাবিক

জাহাজ চলাচল সীমিত হবার আরেকটি কারণ বীমা। যুদ্ধের সময় যুদ্ধঝুঁকির বীমা এতটাই ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে যে অনেক প্রতিষ্ঠান কভারেজই বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে জাহাজের মূল্যের শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ বিমা প্রিমিয়াম দিতে হতো, যা যুদ্ধের সময় ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। তবে বর্তমানে তা কিছুটা কমে ১ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও স্থায়িত্ব নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত বিমা কোম্পানিগুলো এই চড়া হার কমাবে না বলে জানিয়েছেন এনএসআই ইন্স্যুরেন্স গ্রুপের প্রধান অস্কার সিকালি।

আর বীমার এই আধিক্যই জাহাজগুলোকে অপেক্ষা করতে বাধ্য করছে।

এর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে আরেকটি বাস্তবতা। যুদ্ধবিরতি হলেও কেউ নিশ্চিত নন, নতুন করে সংঘাত শুরু হবে না। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা ও বাণিজ্যিক জাহাজে আক্রমণের ঘটনা শিপিং কোম্পানিগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে। তাই জাহাজমালিক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় কোনো বড় ঘটনা না ঘটার নিশ্চয়তা দেখতে চাইছে। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আস্থা পুরোপুরি ফিরতে অন্তত চার মাস সময় লাগতে পারে।

ইরানের বন্দরে আব্বাস সৈকতের কাছে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের দৃশ্য দেখছেন সাধারণ মানুষ

তবু আশার কথা হলো, দুপক্ষের জন্যই এখন প্রণালিটি চালু রাখা প্রয়োজন। তবু পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। কারণ হরমুজের এই ঝুঁকি শুধু যুদ্ধ কিংবা অবরোধের নয়। পানির নিচে মাইন, আকাশে হামলার আশঙ্কা ও মাঝখানে ব্যয়বহুল বীমা— এই তিন স্তরের অনিশ্চয়তাই এখন হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বের সবচেয়ে সংবেদনশীল নৌপথ হিসেবে এক বহুমাত্রিক রূপ দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত দুই দেশের স্বার্থেই এই পথ সচল হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

—বিবিসি, আলজাজিরা ও সিএনএনসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে

আরও