পলিটিকোর বিশ্লেষণ

ট্রাম্পকে সাক্ষী রেখে ইউক্রেনকে এড়িয়ে পুতিনের আলাস্কা জয়

ট্রাম্পও যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যকলাপের ‘সাফাই’ গেয়ে বলেছিলেন যে, পুতিন হাজার হাজার জীবন বাঁচাতে আগ্রহী।

পুতিন এই শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে ট্রাম্পের ক্রোধ থেকে বাঁচতে, রাশিয়ার ওপর আরো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপ ঠেকিয়ে দিতে এবং তার বর্তমান কৌশল চালিয়ে যেতে চেয়েছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট নিজেকে শান্তির জন্য একজন গঠনমূলক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করারও চেষ্টা করেছেন। বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার— ট্রাম্প তার লক্ষ্যে পুরোপুরিই সফল।

আলাস্কায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ থামানোকেই মূল লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শেষ পর্যন্ত আলাস্কা বৈঠক পরিণত হয় এক ধরনের পুরনো বন্ধুদের পুনর্মিলনে। এ বৈঠকে ইউক্রেনকে তার সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে না হলেও পুতিন কূটনৈতিকভাবে বড় জয় পেয়েছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

আলাস্কার অ্যাঙ্করেজের কাছে একটি পুরনো বিমান ঘাঁটিতে নিজ নিজ বিমান থেকে নামার মুহূর্ত থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভ্লাদিমির পুতিনের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ ছিল লক্ষণীয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুশ শাসকের উদ্দেশে হাততালি দিয়েছেন, হাসি বিনিময় হয়েছে, কাঁধে চাপড় পড়েছে এবং লাল গালিচায় তাদের মধ্যে হয়েছে বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তা। এরপর পুতিন প্রোটোকল ভেঙে ট্রাম্পের ‘দ্য বিস্ট’ (মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি গাড়ি) গাড়িতে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলনে যান।

রুশ নেতাকে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত মনে হচ্ছিল, এবং তার আনন্দিত হওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল।

শীর্ষ সম্মেলনের আগে কর্মকর্তা, কূটনীতিক এবং পণ্ডিতদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ছিল যে, ট্রাম্প ‘ধূর্ত’ সাবেক কেজিবি এজেন্ট পুতিনের কাছে বোকা বনে যাবেন। এতে ইউক্রেনকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করা এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কিয়েভ ও তার ইউরোপীয় মিত্রদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে একটি ভঙ্গুর পশ্চিমা জোটকে আরো দুর্বল করার পুতিনের লক্ষ্য আরো শক্তিশালী হবে।

যদিও বাস্তবে এমনটা হয়নি এবং ইউক্রেনকে বিক্রিও করে দেয়া হয়নি। তবুও পুতিন এই বৈঠক থেকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা আদায় করেছেন বলে মনে হচ্ছে।

আলাস্কায় পৌঁছে লাল গালিচায় হাঁটছেন ভ্লাদিমির পুতিন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি-এপি

যুদ্ধাপরাধের জন্য অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও পুতিন এই বৈঠকটি নিশ্চিত করতে পেরেছেন। একটি সার্বভৌম প্রতিবেশী দেশে আগ্রাসন চালানো তথাকথিত কোনো ‘বাজে দেশ’ এর নেতা হিসেবে নয়, বরং একজন বন্ধু হিসেবে তাকে আমেরিকান মাটিতে স্বাগত জানানো হয়েছে। এবং এই সবকিছু তিনি কোনো বড় ধরনের ছাড় না দিয়েই অর্জন করেছেন। যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হয়েই তিনি অ্যাঙ্করেজ ত্যাগ করেছেন। ট্রাম্পও যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রুশ প্রেসিডেন্টের কার্যকলাপের ‘সাফাই’ গেয়ে বলেছিলেন যে, পুতিন হাজার হাজার জীবন বাঁচাতে আগ্রহী।

আলাস্কার এই শীর্ষ সম্মেলনটি ইয়াল্টা সম্মেলনের মতো কোনো ইতিহাস সৃষ্টিকারী বৈঠক ছিল না, যেখানে জোসেফ স্ট্যালিন অসুস্থ রুজভেল্ট এবং অসন্তুষ্ট উইনস্টন চার্চিলকে পশ্চিমা এবং সোভিয়েত বলয়ে ইউরোপকে বিভক্ত করতে বাধ্য করেছিলেন। বা, ১৯৮৬ সালের রেইক্যাভিক সম্মেলনের মতোও ছিল না, যেখানে রোনাল্ড রিগ্যান এবং মিখাইল গর্বাচেভ ভবিষ্যতের পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি স্থাপন করে শীতল যুদ্ধের বরফ গলিয়েছিলেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সম্মানজনক বিলোপের চেষ্টা করা নিয়ে মূল্যায়িত হয় গর্বাচেভের ভূমিকা। অন্যদিকে, বিলুপ্ত সাম্রাজ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে বদ্ধপরিকর ভ্লাদিমির পুতিন।

ট্রাম্পের সাবেক রাশিয়া বিষয়ক কর্মকর্তা ফিওনা হিল থেকে শুরু করে জো বাইডেনের অধীনে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সাবেক সিনিয়র ডিরেক্টর মাইকেল কার্পেন্টারের মতো অভিজ্ঞ পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আলাস্কার বৈঠকটি ছিল ট্রাম্প তথা যুক্তরাষ্ট্রের একটি ভুল পদক্ষেপ। কার্পেন্টার বলেন, ‘এই শীর্ষ সম্মেলন পুতিনকে বিশ্বমঞ্চে বৈধতা দিয়েছে।‘

কেবল বিশ্বমঞ্চে নয়, ক্রেমলিন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াগুলোও এই শীর্ষ সম্মেলনকে ইউক্রেন নিয়ে আলোচনার চেয়ে বরং দুই মহান শক্তির নেতা, পুতিন এবং ট্রাম্পের একসঙ্গে বসে বৈশ্বিক ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণের একটি ঘটনা হিসেবে তুলে ধরতেই ব্যস্ত ছিল। শীর্ষ সম্মেলনের আগে, পুতিন ইউক্রেনের ভূখণ্ডের বিনিময়ে শান্তির প্রস্তাবের জন্য আমেরিকার সমর্থন পেয়েছিলেন, যা কিয়েভের ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে পুতিন ইচ্ছাকৃতভাবে ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। রুশ নেতা এটা বুঝতে পারার মতো যথেষ্ট বুদ্ধিমান যে, ট্রাম্পের প্রতি সম্মানজনক প্রশংসা সবসময়ই ভালো ফল দেয়।

তবে, পুতিন তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখাননি, আর তা হলো ইউক্রেনকে নিয়ন্ত্রণ করা। পুতিন মনে করেন না যে, ইউক্রেনের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব থাকা উচিত। তিনি আবারও যুদ্ধের ‘মূল কারণগুলো’ নির্মূল করার কথা বলেছেন এবং রাশিয়ার ‘নিরাপত্তার প্রতি মৌলিক হুমকি’র কথা উল্লেখ করেছেন। এগুলো মূলত ন্যাটো এবং ইউরোপকে দোষারোপ করার জন্য ব্যবহৃত ক্রেমলিনের পরিচিত শব্দগুচ্ছ।

পুতিন এই শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে ট্রাম্পের ক্রোধ থেকে বাঁচতে, রাশিয়ার ওপর আরো পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা আরোপ ঠেকিয়ে দিতে এবং তার বর্তমান কৌশল চালিয়ে যেতে চেয়েছেন। রুশ প্রেসিডেন্ট নিজেকে শান্তির জন্য একজন গঠনমূলক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করারও চেষ্টা করেছেন। বৈঠক পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের বক্তব্য থেকেই পরিষ্কার— ট্রাম্প তার লক্ষ্যে পুরোপুরিই সফল।

স্বাধীন সংবাদমাধ্যম মেদুজা-এর মতে, ক্রেমলিন রাষ্ট্রীয় মিডিয়াগুলোকে তাদের শীর্ষ সম্মেলন বিষয়ক প্রতিবেদনে ইউক্রেন ইস্যু এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া বিষয়ের ওপর জোর দিতে বলেছিল। ক্রেমলিনের নির্দেশিকায় সাংবাদিকদের বলা হয়েছে, তারা যেন মার্কিন-রাশিয়া সম্পর্কের এজেন্ডা নির্ধারণে পুতিনের ভূমিকাকে তুলে ধরেন এবং ইউক্রেনকে অযৌক্তিক ও আলোচনায় অনিচ্ছুক হিসেবে চিত্রিত করেন।

এই সব কিছুই ইঙ্গিত দেয় যে, পুতিনের যুদ্ধ শেষ করার কোনো তাড়া নেই। বস্তুত, তা করলে তার শাসনব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, কারণ যুদ্ধ অর্থনীতি থেকে সরে আসা অনেক ক্ষেত্রেই বিপজ্জনক সামাজিক-রাজনৈতিক কোন্দলের জন্ম দিতে পারে। আর সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা ইউরোপীয় দেশগুলো এবং ট্রান্সআটলান্টিক জোটের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করবে।

আরও