বণিক বার্তা এক্সপ্লেইনার

লেবাননকে কেন হাতছাড়া করতে চায় না ফ্রান্স?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হবে প্রায় এক শতাব্দী পেছনে

কারণ লেবাননের সঙ্গে ফ্রান্সের আজকের এই গভীর সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর মূলত স্থাপিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর। ১৯২০ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত লেবানন ফরাসি ম্যান্ডেট বা ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল। আর সেই সময়েই ফ্রান্স আজকের আধুনিক লেবাননের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ, তাদের প্রথম সাংবিধানিক কাঠামো গঠন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে ফ্রান্সের প্রভাব আগের মতো নেই। সিরিয়া, ইরাক কিংবা উপসাগরীয় অঞ্চলে এখন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, তুরস্ক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উপস্থিতিই বেশি চোখে পড়ে। কিন্তু একটি দেশকে ঘিরে ফ্রান্সের আগ্রহ আজও কমেনি। আর সেটি হলো লেবানন। যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক ধস কিংবা ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতসহ যে পরিস্থিতিই তৈরি হোক না কেন, ফ্রান্স সবসময় লেবাননকে হাতে রাখতে চায়।

কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতার মধ্যেও লেবাননে নিজের রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান ধরে রাখতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে ফ্রান্স। মূলত ওই অঞ্চলে নিজেদের হারিয়ে যাওয়া প্রভাব পুনরুত্থান এবং মার্কিন আধিপত্যের বিস্তার রোধ করতেই এখন আরো সক্রিয় হয়ে উঠেছে ফ্রান্স।

সম্প্রতি ফ্রান্সের বিশেষ দূত জ্যঁ-ইভ ল্য দ্রিয়াঁর বৈরুত সফরের খবর সেই বাস্তবতাই সামনে এনেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, লেবাননের মতো ছোট একটি দেশকে ঘিরে ফ্রান্স এতটা আগ্রহী কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফিরে যেতে হবে প্রায় এক শতাব্দী পেছনে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯২০ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত লেবানন ছিল ফরাসি ম্যান্ডেট শাসনের অধীনে। সেই সময়ই আধুনিক লেবাননের সীমান্ত নির্ধারণ, সাংবিধানিক কাঠামো গঠন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি করে ফ্রান্স। বিশেষ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে প্যারিসের। আজও লেবাননের অনেক মানুষ ফরাসি ভাষায় কথা বলেন। তখন বৈরুতকে বলা হতো ‘মধ্যপ্রাচ্যের প্যারিস’।

কিন্তু লেবাননের সঙ্গে ফ্রান্সের সম্পর্ক শুধু ইতিহাসেই আটকে নেই। লেবাননকে তারা দেখে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও আরব বিশ্বের একটি কৌশলগত প্রবেশদ্বার হিসেবে। সিরিয়া সংকট, অভিবাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ইউরোপ-আরব সম্পর্কসহ সব ক্ষেত্রেই দেশটির গুরুত্ব রয়েছে।

২০২০ সালে বৈরুত বন্দরের ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ দ্রুত সেখানে পৌঁছে বড় সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিলেন। মানবিক সহায়তার আড়ালে সেটি ছিল ফ্রান্সের আরেকটি বার্তা। আর তা হলো, লেবাননকে ফ্রান্স এখনো নিজেদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ‘মিত্র’ মনে করে।

তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশটির অর্থনৈতিক স্বার্থও। ফরাসি জ্বালানি প্রতিষ্ঠান টোটালএনার্জিস লেবাননের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করছে। একই সময়ে বৈরুত বন্দর ব্যবহার করছে ফরাসি শিপিং কোম্পানি সিএমএ সিজিএম। তাই দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফ্রান্সের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। লেবানন প্রশ্নে ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা পর্যন্ত সব জায়গাতেই ওয়াশিংটনের উপস্থিতি বেশি দৃশ্যমান। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে বৈরুতে সম্ভাব্য ইসরায়েলি হামলা ঠেকানো হয়েছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে ফ্রান্সের আশঙ্কা, লেবাননের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু থেকে তারা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।

এদিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স এখন আর প্রধান খেলোয়াড় নয়। বরং তারা শুধু লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে টিকে থাকার চেষ্টা করছে মাত্র।

আর এই চেষ্টার অন্যতম ভরসা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনিফিল। ১৯৭৮ সাল থেকে এ মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে ফ্রান্স। কিন্তু মিশনের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় বর্তমানে নতুন পথ খুঁজছে দেশটি। এ কারণেই চলতি সপ্তাহে বৈরুত সফরে গিয়ে ফরাসি বিশেষ দূত জঁ-ইভ ল্য দ্রিয়ান লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন, স্পিকার নাবিহ বেরি এবং প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালামের সঙ্গে ইউনিফিল ও অর্থনৈতিক সহায়তা নিয়ে আলোচনা করছেন।

ফ্রান্স এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামতে চায় না। তাদের মূল ভরসা এখন ‘সফট ডিপ্লোম্যাসি’র ওপর। বরং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, মানবিক সহায়তা এবং শত বছরের সম্পর্ককে পুঁজি করে লেবাননে নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে চায়।

আরও