হুথিদের বিরুদ্ধে বড় সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা ইয়েমেনের

ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে বলেছেন, প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার এবং পুরো জাতীয় ভূখণ্ডে রাষ্ট্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করছি।

ইরান-সমর্থিত হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় হুথি ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলার পর এ ঘোষণা এলো। খবর রয়টার্স, বিবিসি।

ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে বলেছেন, প্রজাতন্ত্রের অবশিষ্ট ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার এবং পুরো জাতীয় ভূখণ্ডে রাষ্ট্র ও এর প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করছি।

তিনি বলেন, সংঘাত কমানোর সব সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর পাল্টা অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। হুথিরা সংঘাত প্রশমনের প্রচেষ্টার জবাবে আরও সামরিক তৎপরতা ও উত্তেজনা বাড়িয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সশস্ত্র বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী ও অন্যান্য সামরিক ইউনিটকে অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট।

এর আগে চলতি সপ্তাহে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব ও তাদের ইয়েমেনি মিত্ররা। পরিকল্পনা অনুযায়ী সৌদি বাহিনী আকাশপথে এবং ইয়েমেনি বাহিনী স্থলভাগে অভিযান পরিচালনা করবে।

এদিকে হুথিরা দাবি করেছে, সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর রিয়াদ ও খুরাইস এলাকার স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। গত ১২ ঘণ্টায় ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ৫০টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে এসব হামলা চালানো হয়েছে এবং এতে ওইসব এলাকায় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড হয়েছে বলেও দাবি করেছে গোষ্ঠীটি। তবে এসব দাবির বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে হুথিদের পরিচালিত আল-মাসিরাহ টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, হামলার জবাবে সৌদি আরবও হুথিদের বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। রোববারের এসব হামলায় অন্তত দুজন আহত হয়েছে বলে দাবি করেছে সম্প্রচারমাধ্যমটি।

এর আগে শনিবার ইয়েমেন সরকার জানিয়েছিল, তাদের বাহিনী দেশটির বিভিন্ন এলাকায় হুথিদের অবস্থানে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী সানা, সাদা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তাইজের কাছে হুথিদের অবস্থানও ছিল।

তাইজ ঘিরে তীব্র লড়াই

বর্তমানে ইয়েমেনের প্রধান যুদ্ধফ্রন্ট গড়ে উঠেছে তাইজ শহরকে ঘিরে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা এ শহর দখল নিতে হুথিদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র লড়াই চলছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রোববার তাইজের সঙ্গে ইয়েমেন সরকারের অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করেছে। তিন ইয়েমেনি সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এএফপি জানায়, হুথিরা এখন ওই এলাকা ও সরবরাহপথের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে তাইজ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, তাইজকে এডেন থেকে বিচ্ছিন্ন করার সামরিক লক্ষ্য হুথিরা অর্জন করেছে, যদিও তারা এখনো শহরটির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি।

গত ৪৮ ঘণ্টায় ইয়েমেনের তাইজ শহরের কাছে কৌশলগত পাহাড়ি এলাকাগুলোতে সরকারি ও স্থানীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে হুথিরা আরো অগ্রগতি অর্জন করেছে বলে সামরিক সূত্র জানিয়েছে। এখন তাইজ থেকে দক্ষিণ উপকূলের এডেনের দিকে যাওয়ার শেষ গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দিকে এগোচ্ছে হুথিরা। এডেনেই সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের ঘাঁটি। তাইজ-এডেন সড়কটি হুথিদের নিয়ন্ত্রণে গেলে শহরটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়তে পারে। ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম এ শহরে কয়েক লাখ বেসামরিক মানুষের পাশাপাশি সরকারি বাহিনীর হাজারো সদস্য অবস্থান করছে।

আর তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়গুলো দখলে নিতে পারলে বাব আল-মান্দেবের উপকূলীয় সমতল এলাকাতেও হুথিদের নিয়ন্ত্রণ আরো সুসংহত হবে বলে মনে করছেন তাইজের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোহাম্মদ আল-কাদি। তার মতে, এতে উপকূলীয় এলাকায় সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের সময় হুথিদের পেছনের দিক নিরাপদ থাকবে এবং এসব এলাকা পুনর্দখল করা আরো কঠিন হবে।

তাইজের গুরুত্ব শুধু কৌশলগত অবস্থানের কারণে নয়। ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল-আলিমি এ অঞ্চলের বাসিন্দা। ফলে শহরটি অবরুদ্ধ হলে দেশটির এরই মধ্যে ভয়াবহ মানবিক সংকট আরো তীব্র হতে পারে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) গত সপ্তাহে জানিয়েছে, লড়াই তীব্র হয়ে ওঠায় ইয়েমেনের কিছু এলাকায় প্রতি চার পরিবারের তিনটি পরিবার খাদ্যসংকটে পড়েছে। সংঘাতের কারণে হাজারো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং লাখো মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সরবরাহ পৌঁছানো ব্যাহত হয়েছে।

সৌদি জোটের সামরিক প্রস্তুতি

২০১৫ সালে রাজধানী সানা থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে হুথিরা উৎখাত করার পর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন আরব জোট। এরপর থেকে সৌদি আরব ইয়েমেন সরকারের প্রধান সামরিক ও রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে রয়েছে।

আল-আলিমি সৌদি আরবের সমর্থনের জন্য দেশটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব ইয়েমেনের পাশে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের আঞ্চলিক মিত্র ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের দেশটির সরকার, সামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থনের আহ্বান জানান তিনি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে। কয়েকটি আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশ সৌদি আরবকে মূলত প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে বলেও প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত ছয় ব্যক্তি জানিয়েছেন।
২০১৪ সালে হুথিরা সৌদি-সমর্থিত সরকারের কাছ থেকে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ইয়েমেনে যুদ্ধ শুরু হয়। পরে তারা দেশটির উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এর পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি আন্তর্জাতিক জোট ইয়েমেন যুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে।

কয়েক বছর তুলনামূলক শান্ত থাকার পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বিস্তৃত হওয়ার মধ্যে জুলাইয়ে ইয়েমেনের যুদ্ধ আবার তীব্র হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে হুথিরা সৌদি আরবের জ্বালানি রফতানিতে অবরোধ আরোপের চেষ্টা করছে। ইরানের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় সৌদি জ্বালানি রফতানি এমনিতেই চাপে রয়েছে।

আরও