নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে শনিবার সকাল পর্যন্ত দুদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬৩৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে নেপাল থেকে ৬২৬ জন এবং তিব্বত থেকে ৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। খবর বিবিসি, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান।
দ্য গার্ডিয়ান তাদের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্যে জানিয়েছে, দুদেশ মিলিয়ে এখনো প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ৭৭৭ জন বিদেশী পর্যটক। এর মধ্যে নেপালে ৫১৭ জন বিদেশী পর্যটকসহ ১ হাজার ৯২৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের তিব্বতে ২৬০ বিদেশী পর্যটকসহ অন্তত ৫৫৪ জন নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া এখন পর্যন্ত নেপালে প্রায় ৪ হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দেশটির সরকার।
দুর্গত এলাকায় জীবিতদের উদ্ধারে দ্রুত কাজ করছে উদ্ধারকারী দল। তাদের পাশাপাশি নেপালের সেনারা প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মরদেহের সন্ধান চালাচ্ছেন। তারা জানিয়েছেন, নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করা এবং মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে।
এখনো প্রায় আড়াই হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই বিদেশী পর্যটক, যাদের মধ্যে হিমালয় পাদদেশে নেপালে ভ্রমণে যাওয়া ট্রেকাররাও রয়েছেন। এছাড়া তিব্বতের পবিত্র তুষারঢাকা কৈলাস পর্বতে তীর্থযাত্রায় যাওয়া বহু হিন্দু তীর্থযাত্রীও নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজদের সন্ধান ও আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারে নেপালে নতুন করে আরো ১ হাজার ২০০ সেনা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা থেকে হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেয়া হয়েছে অন্তত ৩ হাজার ২৫৩ জনকে। উদ্ধার হওয়া আহত ব্যক্তিদের কাঠমান্ডু ও আশপাশের হাসপাতাল এবং অস্থায়ী চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। তবে পুরু কাদা, ভেঙে যাওয়া সড়ক-সেতু এবং ভূমিধসের ঝুঁকির কারণে অনেক এলাকায় উদ্ধারকারী দল এখনো পৌঁছতে পারেনি।
উদ্ধারকাজের মধ্যেই নতুন করে বন্যার সতর্কতা জারি করেছে নেপালি পুলিশ। তিব্বতের দিকে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর উদ্ধার ও ত্রাণকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকতে বলা হয়েছে। হিমবাহ ধসের পর পাথর, বরফ ও মাটি জমে গিরং সীমান্তবন্দর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে নতুন একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার ৯৫০ মিটার ওপরে থাকা হ্রদটি শুক্রবার উপচে পড়তে শুরু করে। আরো এক দফা পানি ও ধ্বংসাবশেষ নেমে আসতে পারে—এ আশঙ্কায় সকালে দুর্গত এলাকার দিকে যাওয়া উদ্ধারকারী দলগুলোকে সাময়িকভাবে থামিয়ে দেয়া হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদেরও দ্রুত উঁচু স্থানে চলে যেতে বলা হয়। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলে উদ্ধার অভিযান আবার শুরু হয়।
তিব্বতের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গিরং এলাকায় পৌঁছতেই উদ্ধারকারীদের প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছে। সড়ক ও সেতু নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৬৮০ উদ্ধারকর্মীকে পায়ে হেঁটে ও ভেলায় করে সেখানে পৌঁছতে হয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) হিসাবে, এ দুর্যোগে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের জন্য জরুরি খাবার, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় ও চিকিৎসা সহায়তা প্রয়োজন। সংস্থাটি তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রায় ৩ কোটি ডলারের জরুরি সহায়তার আবেদন জানিয়েছে। নতুন করে বন্যা দেখা দিলে ক্ষয়ক্ষতি ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন নেপালে আইএফআরসির প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার। বিপরীতে পরিস্থিতি মোকাবেলায় এরই মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ কিছু দেশ নেপালে ত্রাণসামগ্রী বা আর্থিক সহায়তা পাঠানোর কথা ঘোষণা দিয়েছে।