পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে ২৮ শিক্ষার্থীসহ অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো ১৯ জন। নিহত শিক্ষার্থীদের বয়স ৭ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।
বৃহস্পতিবার পেশোয়ারের আফ্রিদি আবাদ এলাকায় আল-খায়ের স্কুলে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে। পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনার আফাক ওয়াজির জানিয়েছেন, এরই মধ্যে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেশোয়ারের লেডি রিডিং হাসপাতালের মুখপাত্র মুহাম্মদ আসিম ২৮ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আর নাসিরুল্লাহ খান বাবর মেমোরিয়াল হাসপাতালে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালটির মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট ডা. আবিদ হুসাইন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী ও একজন নারী শিক্ষক রয়েছেন।
উদ্ধারকারী দলের এক সদস্য বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, ভবনের ওপরের তলার ছাদ ধসে নিচের তলার ওপর পড়ে। এতে ভবনের দুটি তলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর পেশোয়ারের ক্যাপিটাল সিটি পুলিশ কর্মকর্তা (সিসিপিও) ডা. মিয়ান সাঈদ আহমেদ বলেন, ভবনটির কাঠামো দুর্বল ছিল। এর ওপর অতিরিক্ত ভার থাকায় ছাদ ধসে পড়ে।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সামিউল্লাহ নামের এক অভিভাবক। তিনি জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে আট বছরের কম বয়সী তিনটি মেয়েকে উদ্ধার করেছেন তিনি।
ডনকে সামিউল্লাহ বলেন, সকাল ৮টা ৫০ মিনিটের দিকে বাড়ি থেকে ফোন পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওনা হন। প্রায় ১০ মিনিট পর সেখানে পৌঁছান। তার ছয় সন্তান ওই স্কুলে পড়ে। তিনি বলেন, ‘ভবনটি দেখে ভেবেছিলাম, আমার ছেলেও মারা গেছে। সে নিচতলার একটি শ্রেণীকক্ষে ছিল, যার ঠিক ওপরের তলা ধসে পড়েছিল। পরে জানতে পারি, পানি খেতে সে শ্রেণীকক্ষ থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।’
তদন্তের নির্দেশ গভর্নরের
স্কুলের ছাদ ধসে প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন খাইবার পাখতুনখোয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্ডি। দুর্ঘটনার কারণ জানতে বিস্তারিত প্রতিবেদন চেয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
এক বিবৃতিতে গভর্নর বলেন, নিরপরাধ শিশুদের প্রাণহানি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আহত শিশুদের সর্বোত্তম চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন তিনি। সেই সঙ্গে প্রদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশও দিয়েছেন কুন্ডি। সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর শোক
এ দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি আহতদের উন্নত চিকিৎসা ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের পাশাপাশি দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নিরাপত্তার মানদণ্ড মেনে নির্মিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করার আহ্বান জানান তিনি।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানান, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহায়তা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে স্কুলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
এবারই প্রথম নয়
পাকিস্তানে দুর্বল অবকাঠামো ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহারের কারণে ভবন ও ছাদ ধসের ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে গত জুলাইয়ে উমরকোটের কাছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরের দেয়াল ধসে তিন শিশু নিহত হয়। একই মাসে লাহোরের বাগবানপুরা এলাকায় নির্মাণাধীন একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে এক শিশু নিহত ও অন্তত পাঁচজন আহত হয়।
গত ৩০ জুন লাহোরের কাহনা এলাকায় একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশু নিহত হয়। এর দুই মাসেরও কম সময় আগে ডেরা গাজি খানের একটি বেসরকারি স্কুলের শ্রেণীকক্ষের ছাদ ধসে চার শিশু নিহত এবং ২০ জন আহত হয়।
এ ছাড়া গত সপ্তাহে প্রবল বৃষ্টি ও ঝড়ের সময় পাকপাত্তানে একটি বাড়ির ছাদ ধসে দুই ব্যক্তি নিহত হন। গত জুনে গুজরাটের লালামুসার খাওয়াসপুর এলাকায় নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ধসে এক শ্রমিক নিহত ও তিনজন আহত হন। একই মাসে লাহোরের নিশতার এলাকায় একটি বাড়ির ছাদ ধসে দুজন আহত হন।
গত আগস্টে ইসলামাবাদের শাহজাদ টাউনে টানা তিন দিনের ভারী বৃষ্টির পর বাড়ির ছাদ ধসে এক দম্পতি নিহত হন। তাদের মেয়েরা এ ঘটনায় আহত হয়।