ইরানে ব্যাপক বিমান হামলা শুরুর ছয় মাস পরও সংঘাতের কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি পায়নি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল । সামরিক অভিযানের পর এবার ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তি প্রয়োগে যে লক্ষ্য অর্জিত হয়নি, কেবল অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তা অর্জন করা কঠিন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নিয়ে স্পষ্টতার অভাব, দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাওয়া এবং কৌশলগত পরাজয়ের ঝুঁকি—সবই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
এর মধ্যে যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে ইরানের সাধারণ মানুষকে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি নিজেদের দেশের নেতৃত্বের সিদ্ধান্তেরও ভুক্তভোগী।
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানিদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। ছয় মাস পর তার প্রশাসন ইরানের অর্থনীতিকে আরো দুর্বল করার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা ছিল, এতে দমনমূলক ও সামরিকনির্ভর সরকারের বিরুদ্ধে ইরানিরা বিদ্রোহ করবে এবং সরকারকে উৎখাত করবে। কিন্তু এমনটা হয়নি।
উল্টো ইরানের নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই সামরিক কর্মকর্তাদের হাতে চলে গেছে। তারা নিজেদের শাসনের টিকিয়ে রাখাকে দেশের টিকে থাকার সঙ্গে এক করে দেখছে। সাধারণ ইরানিদের ত্যাগকে তারা দেশপ্রেম, এমনকি আত্মত্যাগের প্রয়োজনীয় মূল্য হিসেবেও বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে সামান্যতম ভিন্নমতের প্রকাশও কঠোরভাবে দমন করছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত সামরিক শক্তির পরও ইরানকে নিজেদের ইচ্ছামতো পরিচালিত করতে না পারাকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। শুধু ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকেই থাকেনি, বরং হরমুজ প্রণালির ওপরও কার্যত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব আরো বেড়েছে। কয়েক মাস আগেও যেসব দেশ ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল, তারাও এখন তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।
চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও পররাষ্ট্রনীতি বিভাগের প্রধান সুজান ম্যালোনিও যুদ্ধটিকে ব্যর্থ বলে মনে করেন। তার ভাষায়, ইরানের ব্যাপক ক্ষতি হলেও দেশটি আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে উঠে এসেছে। ইরানের প্রতিবেশীরা বুঝতে পেরেছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন হচ্ছে না। তাই তাদের তেহরানের সঙ্গে সহাবস্থানের পথ খুঁজতে হচ্ছে।
মার্কিন মিত্রদের মধ্যেও দেশটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যয়বহুল ও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়িয়ে চলা এবং দেশের অভ্যন্তরে ব্যয় কমানোর যে ভাবমূর্তি ট্রাম্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সাধারণ ইরানিদের মুক্ত করার তার প্রতিশ্রুতিও এখন অনেকটা ফাঁপা শোনাচ্ছে।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক যৌথ হামলা শুরু হয়েছিল। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা নিহত হন। তার ছেলে ও উত্তরসূরি মোজতবা খামেনিও গুরুতর আহত হন।
কয়েক সপ্তাহের তীব্র বিমান হামলায় ইরানের বিমান ও নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু ইরানের জনগণ সরকারবিরোধী বিদ্রোহে নামেনি এবং দেশটির নেতৃত্বেও ভাঙন দেখা যায়নি।
ইরানের সামরিক বাহিনী অনেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় করে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালায়। এসব ঘাঁটির নিরাপত্তাব্যবস্থাও যথেষ্ট ছিল না। একপর্যায়ে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়।
ইরানে কয়েক হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। তবে নিহতের সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। এ যুদ্ধে ১৮ মার্কিন সেনাসদস্যও নিহত হয়েছেন।
‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক চাপের পথে এগোচ্ছে। সোমবার ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এর লক্ষ্য ইরানকে আরো বিচ্ছিন্ন করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে আরো দুর্বল করে দেয়া।
বেসেন্ট বলেন, এটি ইরানের জন্য প্রতিটি শেষ বিকল্পও বন্ধ করে দেয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযান। তার ভাষায়, প্রতিদিন এ অভিযান আরো শক্তিশালী হবে এবং যতক্ষণ না এ শাসন একা হয়ে যায়, ততক্ষণ এটি শেষ হবে না।
তবে ডি-ডে ও বার্লিন প্রাচীর পতনের মতো ঐতিহাসিক ঘটনার উদাহরণ টানলেও বেসেন্ট এ অর্থনৈতিক যুদ্ধ কতদিন চলবে, কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে কিংবা এর চূড়ান্ত লক্ষ্য কী—তা স্পষ্ট করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কি আবারো ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো? নাকি হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বাধ্য করা? অথবা ইরানকে আরো চাপে ফেলে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনে প্রণালি ও দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি টেকসই সমঝোতায় পৌঁছানো?
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের এসফানদিয়ার বতমাঙ্গেলিজদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য কী, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তার মতে, আচরণে কী পরিবর্তন চাওয়া হচ্ছে তা নির্ধারণ না করলে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে নিষেধাজ্ঞা ব্যর্থ হয়।
ইরান এরই মধ্যে হাজার হাজার নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। ফলে আরো কিছু নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি আত্মসমর্পণ করবে—এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বরং সময়ের সঙ্গে ইরান পারস্য উপসাগরে জাহাজ এবং মার্কিন মিত্রদের ওপর হামলা আরো বাড়াতে পারে। এর পরিণতিতে আবারো মার্কিন বিমান হামলা শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির ইরানবিষয়ক বিশ্লেষক সিনা তুসি বলেন, ছয় মাসের যুদ্ধ যে লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, ওয়াশিংটন এখন অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তা অর্জনের চেষ্টা করছে।
তবে তার মতে, ইরানকে ক্ষতিগ্রস্ত করার সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে; কিন্তু সেই ক্ষতি থেকে আত্মসমর্পণ বা শাসনব্যবস্থার পতনে পৌঁছানোর পথটি স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অস্পষ্ট হওয়ায় তেহরানেও বিভ্রান্তি রয়েছে বলে মনে করেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ। তার মতে, ইরানের নেতৃত্ব ভাবছে—যুক্তরাষ্ট্র কি শাসনব্যবস্থার পতন চায়, আত্মসমর্পণ চায়, নাকি সমঝোতা চায়?
ইরানের নেতারা অর্থনৈতিকভাবে চাপে ফেলার এ প্রচেষ্টাকেও যুদ্ধেরই আরেক রূপ হিসেবে দেখছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলে দুটি ঝুঁকি রয়েছে। এটি ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আবার সামরিক উত্তেজনা বাড়ানো ছাড়া পথ কমে আসবে। আর এটি সফল হলে হরমুজ প্রণালির ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙতে ইরান পাল্টা উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
ভায়েজের মতে, কোনো পরিস্থিতিতেই ট্রাম্প প্রশাসনের কাঙ্ক্ষিত ফল আসার সম্ভাবনা বেশি নয়। নিষেধাজ্ঞাকে যুদ্ধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার বদলে এটি বরং নতুন করে সামরিক সংঘাতের সূচনা করতে পারে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফসহ দেশটির নেতারা যুদ্ধের অবসানের অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে বলছে। তারা সতর্ক করে দিয়েছে, ক্ষুধার্ত মানুষ এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তাদের অবস্থানও একই রয়েছে। তারা অন্তত জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে ফিরে যাওয়ার দাবি জানাচ্ছে। ট্রাম্প অবশ্য এখন সেটিকে ‘শেষ হয়ে গেছে’ বলে ঘোষণা করেছেন। একই সময়ে ইরান হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যে ব্যবস্থাটি ওয়াশিংটনের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ইরান যত ছাড় দিক না কেন, অর্থনৈতিক সুবিধা ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির ওপর ব্যাপক অবিশ্বাস রয়েছে। অর্থনীতি সংকটাপন্ন হলেও ইরানের নেতারা হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে ঐক্যবদ্ধ।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিকে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। তার বাবার তুলনায় তিনি ঝুঁকি নিতে বেশি আগ্রহী বলেও ধারণা করা হয়। তবে তিনি এখনো জীবিত আছেন কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তার কার্যালয় থেকেও সর্বশেষ বিবৃতি এসেছে ৯ আগস্ট।
এ মুহূর্তে পরিস্থিতি অনেকটাই স্থির। দুই পক্ষের মধ্যে সরাসরি হামলা নেই। হরমুজ প্রণালির উভয় দিকেই তুলনামূলকভাবে শিথিল অবরোধ চলছে, ফলে কিছু পরিমাণ তেল সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
নতুন অর্থনৈতিক চাপের কৌশলের একটি সুবিধা হলো, এটি ধীরে ধীরে কার্যকর হয় এবং এর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পরিমাপ করা কঠিন। ফলে সংঘাতের উত্তেজনাও কিছুটা কম থাকে। এতে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে তারা বিজয় খুব কাছেই—এমন বার্তাও দিতে পারবে।
তবে এ অচলাবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এলি গেরানমাইয়েহ। তার মতে, হোয়াইট হাউসে ক্রমেই এমন ধারণা শক্তিশালী হচ্ছে যে এ ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাওয়া সম্ভব নয়। তেহরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষই যদি মনে করে অন্য পক্ষের সঙ্গে কোনো চুক্তি সম্ভব নয়, তাহলে পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তা জেরেমি শাপিরোও প্রশ্ন তুলেছেন, কেন ট্রাম্প এত বড় এবং দেশের ভেতরে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় একটি যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাব্য পথগুলো গ্রহণ করছেন না।
তার মতে, আরো বেশি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন আসলে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করছে, যেখানে তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ভান করছে—বিজয় অর্জনের ভানও করছে না, আবার পরাজয় স্বীকারও করছে না।
শেষ পর্যন্ত, শাপিরোর ভাষায়, ইরানের নেতৃত্ব এ যুদ্ধের মূল্য দেবে না; সেই মূল্য দিতে হবে দেশটির সাধারণ মানুষকেই।