নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে জ্বালানি তেল বিক্রি এবং চীন থেকে সামরিক সরঞ্জামসহ বিলিয়ন ডলারের পণ্য কেনার জন্য পণ্য বিনিময়ভিত্তিক বিশেষ ব্যবস্থা ব্যবহার করছে ইরান। এ ব্যবস্থায় তেলের বিনিময়ে চীনা পণ্য আমদানির জন্য ক্রেডিট দেয়া হয়। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত দুই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও আরো তিনজনের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে রয়টার্স।
পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইরানের ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সূত্রগুলো জানিয়েছে, এ অবস্থায় গোপন বাণিজ্যব্যবস্থা তেহরানের জন্য আর্থিক লাইফলাইন হিসেবে কাজ করেছে।
একইসঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিকারক চীনও এতে লাভবান হয়েছে। নিশ্চিত হচ্ছে কম দামে ইরানি তেলের সরবরাহ।
ইরানি জ্বালানি তেল কেনা বা পরিবহনে সহায়তার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি ছোট চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে— এমন কঠোরতম পদক্ষেপ থেকে ওয়াশিংটন এখনো বিরত রয়েছে।
চলমান যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর চেষ্টা হিসেবে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র চাপ আরো বাড়িয়েছে। গত মাসে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারদের সম্পর্ক ছিন্ন করার সতর্কবার্তা দেন। তিনি জানান, তা না হলে দেশগুলো ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বাদ পড়তে হতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ দিয়েছে, তাতে পণ্য বিনিময়ভিত্তিক এ ব্যবস্থার ওপর কী প্রভাব পড়েছে— তা নির্ধারণ করতে পারেনি রয়টার্স। গত সপ্তাহে বার্তা সংস্থাটি জানিয়েছিল, ১৪ জুলাই অবরোধ পুনর্বহালের পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে চীনে ইরানি জ্বালানি তেলবাহী কোনো চালান সফলভাবে যেতে পারেনি।
চীন ও ইরান বারবার পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক আইনের বাইরে একতরফা পদক্ষেপ হিসেবে নিন্দা করেছে এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার অঙ্গীকার করেছে। তবে দুই দেশ আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে কীভাবে বাণিজ্য চালু রাখছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে খুব কমই জানিয়েছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলমান ব্যবস্থায় চীন থেকে ওষুধ, যানবাহন ও যোগাযোগ সরঞ্জাম কিনেছে তেহরান। এসব পণ্যের নির্মাতারা সরাসরি ইরানের সঙ্গে লেনদেন করেনি এবং তারা নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করেছে—এমন কোনো ইঙ্গিতও নেই। গত এক বছরে অন্তত একবার কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের ইরানের জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তির ক্ষেত্রেও এ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে।
পণ্য বিনিময়ভিত্তিক বাণিজ্যব্যবস্থা সম্পর্কে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘আপনারা যে পরিস্থিতির কথা বলছেন, সে বিষয়ে আমরা অবগত নই।’
মন্ত্রণালয় আরো বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি নেই এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনও নেই—এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞার চীন সবসময় বিরোধিতা করে।’
এক দশকের বেশি সময় আগে ইরান ও বিশ্বের কয়েকটি শক্তিধর দেশের মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি হয়। সেই চুক্তি থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর ইরান চুক্তির কিছু শর্ত মানা বন্ধ করে। এরপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্যান্য নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে ইরানে অধিকাংশ প্রধান প্রচলিত অস্ত্র রফতানির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাও পুনর্বহাল করা হয়।
হোয়াইট হাউজে করা প্রশ্নের জবাবে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-সহ অর্থনৈতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছে, যাতে ‘ইরানকে তার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এগিয়ে নেয়ার বস্তুগত সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করা যায়।’ তবে উল্লেখিত বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে চলা
দশকের পর দশক ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের জ্বালানি তেল কেনার মতো ক্রেতা কমে গেছে। পণ্যবাণিজ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যানুযায়ী, গত বছর সমুদ্রপথে ইরানের পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশের বেশি কিনেছে চীন। এসময়ে দৈনিক গড়ে ১৪ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পাঠানো হয়েছে।
২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। এতে জ্বালানি ও অবকাঠামোর মতো বিভিন্ন খাত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
জানা গেছে, লেনদেনে কয়েকটি পদ্ধতি করে চীন-ইরান। এর একটিতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে সরাসরি চীনা কোম্পানিকে অর্থ না দিয়েই চীন থেকে পণ্য ও সেবা কিনতে পারে ইরান।
বিষয়টির সঙ্গে জ্ঞাত ব্যক্তিরা জানান, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি তেল প্রতিষ্ঠান ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করা এক ক্রেতা চলতি বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে কয়েক কোটি ডলার জমা দিত চীনের একটি অপরিচিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানটির নাম চুশিন।
গোয়েন্দা তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ওই ব্যক্তিরা জানান, চুশিনে জমা করা অর্থ হংকংয়ে নিবন্ধিত একটি কোম্পানির সঙ্গে করা পণ্য চুক্তির অর্থ পরিশোধে ব্যবহৃত হতো। ওই কোম্পানিটি ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত।
এরপর চুশিন চীনা রফতানিকারক ও ইরানে অবকাঠামো নির্মাণকারী কোম্পানিগুলোকে অর্থ পাঠাত। ধারণা করা হচ্ছে, এ অর্থ চীনের অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাঠানো হতো।
তিনটি সূত্র জানিয়েছে, চুশিনের মাধ্যমে পরিচালিত ইরানি জ্বালানি তেল বিক্রির অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশ অবকাঠামো প্রকল্পে বরাদ্দ করা হয়। গত বছরের অক্টোবরে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রথম এ ব্যবস্থার বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। বাকি অর্থ জমা হয় একটি বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিষ্ঠানের (এসপিভি) হিসাবে। ইরানে পণ্য সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোকে অর্থ পরিশোধে এ অর্থ ব্যবহার করা হয়।
তবে চীনের নিবন্ধন নথিতে চুশিন নামে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। একইভাবে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে কাজ করছে বলে কথিত প্রতিষ্ঠানগুলোরও কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। একটি সূত্র বলেছে, চুশিন হয়তো শুধু একটি স্প্রেডশিটেই অস্তিত্বশীল।
দায় অস্বীকারের সুযোগ রেখে লেদদেন
ইরানের সঙ্গে কথিত লেনদেনের কারণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ঝুহাই ঝেনরং। একটি সূত্র এমন একটি নথি রয়টার্সকে দিয়েছে, যা ২০২৫ সালের ২২ জুলাই ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির পক্ষ থেকে চীনা তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানটির কাছে পাঠানো চিঠি বলে মনে হয়েছে। এতে বকেয়া অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। ওই ব্যক্তির দাবি, এটি দুই প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সম্পর্কের প্রমাণ।
রয়টার্সের কাছে সূত্রগুলো জানিয়েছে, অন্তত ২০২১ সাল থেকে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। শুরুতে ইরানে ওষুধ ও কভিড-১৯ টিকা সরবরাহে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল।
সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা কোম্পানিগুলোর ওপর ওয়াশিংটন চাপ বাড়িয়ে দেয়ায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থার গুরুত্বও বেড়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, গত এক বছরে এসপিভির মাধ্যমে ২০০ কোটি থেকে ২৫০ কোটি ডলার প্রবাহিত হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক প্রভাষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লি বলেন, চাপ মোকাবিলা করতে এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকিতে যে পিছিয়ে যাবে না, তা দেখাতে এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করছে চীন।
তবে তিনি বলেন, চীনের নেতারা তাদের ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান না।
তিনি বলেন, ‘তারা বিশ্বাসযোগ্যভাবে অস্বীকার করার সুযোগ চায়।’