যুক্তরাষ্ট্র অবরোধ তুলে নিলে কয়েক দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে পারে ইরান। মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরুর ‘সোনালি সুযোগ’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান দুজনই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেয়ার কথা রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর এই প্রথম একই অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিত হওয়ার কথা।
ইরানি ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরুর জন্য ইরানের প্রতিনিধিদলের পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। তবে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে সরাসরি বৈঠকের কোনো পরিকল্পনা নেই।
এর আগে জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছিল। ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ান এতে স্বাক্ষর করার কয়েক সপ্তাহ পরই চুক্তিটি ভেস্তে যায়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে কোনো সরাসরি বৈঠক হয়েছে বলে জানা যায়নি।
ইরানি কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ঘোষণা দিতে হবে, তারা কূটনৈতিকভাবে বিষয়টির সমাধান করতে চায়। এরপর সেটি আনুষ্ঠানিক করতে হবে এবং আলোচনা কীভাবে এগোবে, তার একটি সময়সূচিতে সম্মত হতে হবে।
তিনি বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিতে ফিরে আসার একটি সোনালি সুযোগ। গত ১৬ সেপ্টেম্বর মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান তার সর্বশেষ প্রস্তাব ওয়াশিংটনের কাছে পাঠিয়েছে বলেও জানান তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এনবিসির টুডে অনুষ্ঠানে বলেন, সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। বিশেষ করে সেই আলোচনা ইতিবাচক ফল বয়ে আনার এবং শেষ পর্যন্ত চলমান সংকটের লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা থাকলে যুক্তরাষ্ট্র এতে আগ্রহী।
যুদ্ধে সৌদি আরবের ঝুঁকি বাড়ছে
মঙ্গলবার উপসাগরীয় ছয় দেশের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। দেশগুলো হলো বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ওমান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশগুলো হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করতে আগ্রহী। তবে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে তারা।
ওমান ছাড়া এসব দেশের সবগুলোতেই বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। যুদ্ধজুড়ে এসব ঘাঁটি ইরানের বারবার হামলার লক্ষ্য হয়েছে। এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেশগুলোর কয়েক দশকের নিরাপত্তা অংশীদারত্বও চাপে পড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সৌদি আরব চলতি মাসে যুদ্ধে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে। ইরান-সমর্থিত হুতি যোদ্ধারা ইয়েমেনে অগ্রসর হয়ে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে পিছু হটতে বাধ্য করেছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরবের তেল রফতানিও হুমকির মুখে পড়েছে।
মঙ্গলবার তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি আসে। রয়টার্সকে কয়েকটি সূত্র জানায়, সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে কম পরিমাণে হলেও রফতানি শুরু করতে পারবে দেশটি।
হরমুজ প্রণালির যুদ্ধকালীন বিঘ্ন এড়িয়ে তেল রফতানির জন্য সৌদি আরবের প্রধান বিকল্প পথ এই পাইপলাইন। ১০ সেপ্টেম্বর হামলার পর এটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ওই হামলার জন্য ইরানের মিত্র ইরাকি গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছিল রিয়াদ।
ইয়েমেনে হুথিরা সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে পিছু হটিয়ে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সৌদি আরবেও সরাসরি হামলা চালিয়েছে তারা।
গত বছর দুই মাস হুথিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তবে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত হুথিদের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধে জড়াতে রাজি হয়নি ওয়াশিংটন।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার শেষ মুহূর্তে হুতিদের বিরুদ্ধে মার্কিন হামলা বাতিল করেন ট্রাম্প। ওই প্রতিবেদন বলছে, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের কিছু আগেই সেনারা বিমানে বোমা তোলা শুরু করেছিল।
কাতারের নিরাপত্তা প্রস্তাব
ট্রাম্পের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের বৈঠকে কাতারের একটি প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইরান ও আরব উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি অভিন্ন নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় আনার জন্য এ প্রস্তাব করা হয়েছে।
গত রোববার নিউইয়র্কে কাতার ইকোনমিক ফোরামে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থায় উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানোর বিষয় থাকতে হবে।
তিনি বলেন, বারবার উত্তেজনা ও পাল্টা প্রতিক্রিয়ার চক্রের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। এমন কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমেও নয়, যেখানে কোনো একটি দেশ স্থায়ীভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকে।
অঞ্চলটির আরেকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ইরান প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করছে।
কাহবুব পাহাড় দখলের লড়াই
ইয়েমেনে হুথি যোদ্ধারা কাহবুব পর্বতমালার কৌশলগত উচ্চভূমি দখলের চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে লোহিত সাগরের উপকূলকে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা বাকি অঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় তারা।
কাহবুব এলাকা ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে নজর রাখে। ফলে এটি দখলে নিতে পারলে উভয় এলাকার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারে হুতিরা। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে উপকূলীয় সমতলের তুলনায় সেখানে ড্রোন ও বিমান হামলা থেকে হুতি যোদ্ধাদের লুকিয়ে থাকা সহজ।
চলতি মাসে ইয়েমেনে সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা মঙ্গলবার জানিয়েছে, আরো কয়েক দশ হাজার মানুষকে ঘরবাড়ি ছাড়তে হতে পারে।