বৈঠক শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ঘোষণা দেন, ‘ইতিবাচক বিষয় হলো আলোচনা হয়েছে। খারাপ খবর হলো কোনো চুক্তি হয়নি।’ এজন্য ইরানকে দায়ী করেন তিনি। অন্যদিকে আলোচনার নেতৃত্বে থাকা ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের কালিবাফ জানিয়েছেন, মার্কিন প্রতিনিধিরা আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছেন। একটি মাত্র দফায় চুক্তিতে পৌঁছার প্রত্যাশা অবাস্তব জানিয়ে ইরান বলছে, আপাতত আলোচনা পুনরায় শুরু করার কোনো পরিকল্পনাও নেই। আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত আবদার’-কে দায়ী করেছে তেহরান।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরই পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। হরমুজ প্রণালি অবরোধের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে ইরানে পুনরায় হামলা শুরুর হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। গতকাল রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, মার্কিন নৌবাহিনী অবিলম্বে হরমুজে সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করবে। তিনি লিখেছেন, অবিলম্বে কার্যকর হওয়া এ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হওয়ার চেষ্টাকারী যেকোনো জাহাজ অবরোধ করা শুরু করবে। যারা ইরানকে অবৈধভাবে টোল দেবে, গভীর সমুদ্রে তাদের নিরাপদ চলাচলের কোনো নিশ্চয়তা থাকবে না।
ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আবারো সামরিক অভিযানের ইঙ্গিত দেন। তিনি লক্ষ্যবস্তু হিসেবে দেশটির পানি শোধনাগার, বিদ্যুৎ গ্রিড ও সেতুগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। ‘সানডে মর্নিং ফিউচারস’ অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সামরিক অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তবে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা অক্ষত রয়েছে। বিশেষ করে পানি শোধনাগারকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, এখন আসলে যা বাকি আছে তা হলো তাদের পানি ব্যবস্থা, যেটিতে আঘাত হানা হলে তা অত্যন্ত বিধ্বংসী হবে। এছাড়া ইরানে এখনো কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র সক্রিয় রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, এসব স্থাপনার অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের জানা আছে এবং প্রয়োজন হলে সেগুলোতেও হামলা চালানো হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’ এবং প্রয়োজন হলে ইরানকে শেষ করে দেয়া হবে।
যুক্তরাজ্য এবং আরো কয়েকটি দেশ প্রণালিতে মাইন পরিষ্কারের জন্য মাইনসুইপার যুদ্ধজাহাজ পাঠাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে কোন কোন দেশ এতে অংশ নিচ্ছে, তা বিস্তারিত উল্লেখ করেননি তিনি। ট্রাম্প দাবি করেন, প্রয়োজন হলে মাত্র একদিনেই ইরানকে সামরিকভাবে অচল করে দেয়া সম্ভব।
তবে ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হাজি বাবেয়ি হরমুজ প্রণালিকে তেহরানের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, প্রণালিটি পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং এখান দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য অবশ্যই ইরানি মুদ্রা ‘রিয়ালে’ টোল পরিশোধ করতে হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে দিয়েছেন যে আবার আক্রমণ হলে ইরান পাল্টা জবাব দেবে। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) বলছে, কোনো ভুল পদক্ষেপ নিলে শত্রুপক্ষকে প্রণালির ‘মৃত্যুঘূর্ণিতে’ আটকে ফেলা হবে। আইআরজিসির নৌ-কমান্ড এক বিবৃতিতে জানায়, হরমুজ প্রণালিতে যেকোনো ভুল হিসাব বা শত্রুতামূলক পদক্ষেপ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। তাদের দাবি, প্রণালির পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এবং সেখানে চলাচল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
এর আগে গতকাল সকালে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার খবর জানিয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইরানকে এজন্য দায়ী করেন। তিনি বলেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার বিষয়ে কোনো মৌলিক প্রতিশ্রুতি দিতে পারেনি। তিনি আরো জানান, এ ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানের জন্যই বেশি ক্ষতিকর। ভ্যান্স আরো জানান, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘চূড়ান্ত এবং সেরা প্রস্তাব’ পেশ করেছে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পেছনে ওয়াশিংটনকে দায়ী করে তাসনিম নিউজ দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘অতিরিক্ত দাবি’ একটি সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, আলোচনায় দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধের বেশকিছু বিষয় ছিল। এর মধ্যে অন্যতম হলো হরমুজ প্রণালিতে নৌ-চলাচলের অধিকার এবং ইরানের পারমাণবিক অধিকার। মূলত এ বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষ একমত হতে না পারায় কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে উচ্চপর্যায়ের এ কূটনৈতিক তৎপরতা।
নিউইয়র্ক টাইমস সূত্রে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে পূর্ণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং প্রায় ৯০০ পাউন্ড মজুদ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেয়ার দাবি জানিয়েছিল, যা ইরান মেনে নিতে রাজি হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনা অবিশ্বাসের পরিবেশে পরিচালিত হয়েছে এবং একটি মাত্র দফায় চুক্তিতে পৌঁছার প্রত্যাশা অবাস্তব। আপাতত আলোচনা পুনরায় শুরু করার কোনো পরিকল্পনাও নেই বলে তারা জানিয়েছে।
ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান বাঘের গালিবাফ জানান, আলোচনা শুরুর আগেই তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করেছিলেন যে ইরানের প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা ও সংকল্প রয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিগত দুটি যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কারণে প্রতিপক্ষের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই।’ ইরানি স্পিকারের মতে, এবারের আলোচনায়ও প্রতিপক্ষটি ইরানের প্রতিনিধি দলের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।