ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আজ

ভোটে বড় ইস্যু ট্রাম্প, অপরাধ-দুর্নীতি নিয়ে ভোটারদের অনাস্থা

৮০ বছর বয়সী লুলা চতুর্থ এবং সম্ভবত শেষবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত, দুই মেয়াদে ব্রাজিল শাসন করেছেন তিনি। এরপর রাজনৈতিক জীবনে বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ২০২৩ সালে আবারও প্রেসিডেন্ট হন। দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে লুলাকে ৫৮০ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল

দুর্নীতির কেলেঙ্কারি, তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ভোটারদের ক্রমবর্ধমান অনাগ্রহের মধ্যে ব্রাজিলে শুরু হয়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। স্থানীয় সময় সকাল আটটায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলবে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত। প্রেসিডেন্ট পদে আবারও মুখোমুখি হয়েছে দেশটির দুই রাজনৈতিক শিবির। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ও ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। খবর সিএনএন।

৮০ বছর বয়সী লুলা চতুর্থ এবং সম্ভবত শেষবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত, দুই মেয়াদে ব্রাজিল শাসন করেছেন তিনি। এরপর রাজনৈতিক জীবনে বড় ধরনের প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ২০২৩ সালে আবারও প্রেসিডেন্ট হন। দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে লুলাকে ৫৮০ দিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল। তবে ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে দেয়া সাজা বাতিল করে এবং রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়। এরপর ২০২২ সালের নির্বাচনে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোকে হারিয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরেন লুলা।

এবার তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারো। জইর বলসোনারোর গড়ে তোলা রাজনৈতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন ফ্লাভিও । বর্তমানে স্বাস্থ্যগত কারণে মানবিক বিবেচনায় গৃহবন্দি জইর বলসোনারো। ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয় উল্টে দিতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার দায়ে তাকে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ফলে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই তার।

লুলা ও ফ্লাভিও'র ছাড়াও রয়েছেন আরো চার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। তারা হলেন মধ্যপন্থি মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও লেখক অগুস্তো কুরি, ডানপন্থি সাবেক গোইয়াস গভর্নর রোনালদো কাইয়াদো, ডানপন্থি রাজনৈতিক সংগঠন ‘মুভিমেন্তো ব্রাজিল লিভরে’র প্রতিষ্ঠাতা রেনান সান্তোস এবং মিনাস জেরাইস রাজ্যের সাবেক গভর্নর রোমেউ জেমা।

বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলে অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য ভোট দেয়া বাধ্যতামূলক। দেশটিতে ভোটার উপস্থিতিও সাধারণত আমেরিকা মহাদেশের অন্য দেশগুলোর তুলনায় বেশি। প্রথম দফার ভোটের আগে প্রকাশিত সর্বশেষ কয়েকটি জনমত জরিপে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। তবে কোনো প্রার্থী মোট বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে নির্বাচন দ্বিতীয় দফায় গড়াতে পারে। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দুই প্রার্থীর মধ্যে ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোট হবে।

ব্রাজিলের নির্বাচন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। লুলা বহুমুখী বা বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লুলার সম্পর্কেও টানাপোড়েন বেড়েছে। ব্রাজিলের পণ্য আমদানিতে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতি এবং লাতিন আমেরিকায় সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলায় মার্কিন নীতিকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের পক্ষে ফ্লাভিও বলসোনারো। জুলাইয়ে তার নির্বাচনী প্রচারের উদ্বোধনে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে সমর্থন জানান নেতানিয়াহু। মে মাসে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকও করেন ফ্লাভিও। সেখানে সংগঠিত অপরাধ, শুল্ক ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে আলোচনা হয়।

নির্বাচনে অপরাধ ও জননিরাপত্তাও বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে। লুলার তুলনায় ফ্লাভিও এ বিষয়ে আরো কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বড় অপরাধী চক্রগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা, নতুন ফেডারেল কারাগার নির্মাণ এবং অপরাধের জন্য দায়বদ্ধতার ন্যূনতম বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রও চলতি বছর ব্রাজিলের দুটি শক্তিশালী অপরাধী সংগঠনকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তবে লুলার সরকার এর বিরোধিতা করে বলেছে, সন্ত্রাসবিরোধী কাঠামো প্রয়োগ বিদেশি হস্তক্ষেপের অজুহাত তৈরি করতে পারে।

অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। বেকারত্ব কম এবং মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে আসছে, এমন সরকারি পরিসংখ্যান থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক স্বস্তি তেমন দেখা যাচ্ছে না। বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ব্রাজিলীয় মনে করছেন তাদের আয় দিয়ে আগের মতো জীবনযাত্রা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। লুলার প্রথম দুই মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য কমার কারণে ব্যাপক সামাজিক অগ্রগতি হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই ধরনের পরিবর্তন সাধারণ মানুষের কাছে ততটা দৃশ্যমান নয়।

অন্যদিকে বাবার জনপ্রিয় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধরে রেখেও নিজস্ব পরিচয় তৈরি করা ফ্লাভিওর জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিনি জইর বলসোনারোর পরিবারের তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী সদস্য। এতে মধ্যপন্থী ভোটারদের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে, তবে বাবার মতো উচ্ছ্বাস তৈরি করা তার জন্য কঠিন।

নারী ও ধর্মীয় ভোটও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এবারের নির্বাচনে ভোটারদের মধ্যে আগের মতো উৎসাহ নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষায়, ব্রাজিলে ‘উদাসীন মেরুকরণ’ তৈরি হয়েছে—রাজনৈতিকভাবে মানুষ এখনো দুই শিবিরে বিভক্ত, কিন্তু আগের মতো উৎসাহী নয়।

আরও