সমুদ্রে ঢেউ পেরিয়ে স্পেনের সিউতা ভূখণ্ডে পৌঁছাতে পেরেছিল এক কিশোরী। কিন্তু তার ছোট ভাই পারেনি, ভূমধ্যসাগরে ডুবে মৃত্যু হয়। আর সীমান্তের সমুদ্রবাধ ঘুরে সাঁতরে যাওয়ার সময় মাও নিখোঁজ হন।
এপির এক প্রতিবেদন অনুসারে, সিউতায় আটকে পড়েছে আট শতাধিক অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী। ট্যাঙ্গিয়ারের ১৭ বছর বয়সী ওই কিশোরীর মর্মান্তিক কাহিনি এখন শত শত শিশুর বর্তমান দুর্দশা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি।
অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকায় ওই কিশোরীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। সে জানায়, গত বৃহস্পতিবার মা ও ছোট ভাইসহ সীমান্তের বেড়া ঘুরে সাঁতরে স্পেনের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল সে। অন্য অনেকের মতো তারাও উন্নত জীবনের আশায় এই ঝুঁকি নিয়েছিল।
কিশোরীটি জানায়, চোখের সামনে স্প্যানিশ পুলিশকে ৮ বছর বয়সী ভাইয়ের মরদেহ পানি থেকে উদ্ধার করতে দেখেছে।
কোনোমতে তীরে উঠতে পারলেও মায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান সে। এরপর গত চার দিন তিনি একাই কাটিয়েছেন। স্থানীয় কিছু মানুষ তাকে খাবার ও কাপড় দিয়েছেন। এক নারী তাকে নিজের বাসায় নিয়ে গোসল করার সুযোগও করে দেন। পরে সরকারি শিশু আশ্রয়কেন্দ্রে সাহায্য চাইতে গেলে দেখা যায়— সেটি এরই মধ্যে পূর্ণ।
একজন দোভাষীর মাধ্যমে কিশোরীটি বলে, ‘আমি দেখেছি মৃতদেহের ওপর দিয়েও লোকজন হেঁটে যাচ্ছে। এখন আমরা শিশুরা রাস্তায় ভিক্ষা করছি।’
স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত স্পেনের ভূখণ্ডটিতে প্রবেশ করা প্রায় ৮৬০ অপ্রাপ্তবয়স্ক সেখানে রয়ে গেছে। এপির সাংবাদিকরা কয়েকটি শিশুকে খাবারের জন্য হাত পাততে দেখেছেন।
এ শিশুরা এখন সিউতায় থেকে যাওয়া প্রায় ৩-৫ হাজার অভিবাসীর বড় একটি অংশ। শুরুতে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করলেও অধিকাংশকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই গণঅনুপ্রবেশের সময় ৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই পানিতে ডুবে মারা যান। অন্যদিকে মরক্কো ১১ জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে, যা নিজেদের হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয় বলে স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
স্পেনের আইনে অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষার বিধান
স্পেনের আইন অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীরা আশ্রয়ের আবেদন করতে পারেন। আবেদন নাকচ হলে তাদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। তবে মরক্কোর নাগরিকদের মানবিক সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ সাধারণত খুবই সীমিত।
কিন্তু কোনো প্রাপ্তবয়স্ক অভিভাবক ছাড়া থাকা অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসীদের আইন অনুযায়ী সুরক্ষা দেয়া এবং তাদের দেখভালের দায়িত্ব স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের।
এপির এক সাংবাদিক দেখেছেন, একা থাকা এক মরক্কোর কিশোরকে স্প্যানিশ সেনারা সীমান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ছেলেটি কান্নাকাটি করছিল এবং মরক্কোয় ফেরত না পাঠানোর জন্য অনুরোধ জানাচ্ছিল। সীমান্তে পৌঁছানোর কয়েক মিটার আগে স্থানীয় বাসিন্দারা ছেলেটি অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে প্রতিবাদ করেন। সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতিও ছিল। এরপর স্প্যানিশ সেনাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বন্ধ করে তাকে স্প্যানিশ সিভিল গার্ডের কাছে হস্তান্তর করেন।
মরক্কোর অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী হয় স্বেচ্ছায় ফিরে গেছেন, নয়তো স্প্যানিশ পুলিশ তাদের ফেরত পাঠিয়েছে। তবে সিউতায় এখনো সুদান, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে পালিয়ে আসা মানুষ, গাজার ফিলিস্তিনি, আফগানিস্তান এবং আফ্রিকার আরো কয়েকটি দেশের নাগরিক অবস্থান করছেন।
৬০০ জন ধারণক্ষমতার স্থানীয় অভিবাসী কেন্দ্রটি পুরোপুরি ভর্তি হয়ে গেছে। এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেখানে অবস্থানরত অভিবাসীদের মধ্যে খাবারের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় অভিবাসন–অধিকারকর্মী এবং আসোসিয়াসিওন এলিনের প্রতিনিধি রামসেস মোহাম্মদ আজুমিক বলেন, ‘কৌশলটি হলো—ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও চরম ক্লান্তি যেন শেষ পর্যন্ত মানুষগুলোকে স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে যেতে বাধ্য করে।‘
অনেক অভিবাসী সিউতার সমুদ্রসৈকত কিংবা আশপাশের পাহাড়ে রাত কাটাচ্ছেন বা বিশ্রাম নিচ্ছেন। দূরে কুয়াশার আড়ালে সমুদ্রের ওপারে দেখা যায় মূল ইউরোপের ভূখণ্ড—যেখানে পৌঁছানোই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।