আল জাজিরা

বেঁচে থাকার লড়াই: যুদ্ধ গাজার শ্রমবাজারকে যেভাবে বদলে দিয়েছে

যুদ্ধ গাজার সমাজকে কয়েক দশক পেছনে ঠেলে দিয়েছে, ফিরে এসেছে পুরোনো পেশা। আবার এমন কাজ তৈরি হয়েছে যা আগে কখনো ছিল না। এ ধরনের অস্থায়ী পেশাগুলো অনেক ফিলিস্তিনিকে ‘নিশ্চিত মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে এনেছে’। এগুলো ন্যূনতম আয় ও মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে

ফিলিস্তিন অধিকৃত গাজা সিটির রেমাল বাজারের এক কোণে ছোট্ট একটি ত্রিপল টাঙানো ঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোন চার্জ দিচ্ছেন ২৫ বছর বয়সী আবদুলরহমান আল-আওয়াদি। যুদ্ধের সময় তৈরি হওয়া এ অস্থায়ী কাজই এখন তার জীবিকার একমাত্র ভরসা।

নিজের তৈরি করা এ ছোট চার্জিং স্টেশনের তাকজুড়ে রাখা মোবাইল ফোন ও চার্জিং ইউনিটের ওপরে ঝুলছে আওয়াদির আঁকা কিছু ছবি। এগুলো তার হারিয়ে যাওয়া শিল্পীজীবনের শেষ স্মৃতি। সেসব ভুলে এখন তিনি মাথার ওপর লাগানো সৌর প্যানেলের দিকে তাকিয়ে সূর্যালোকের তীব্রতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের হিসাব করেন। কারণ এটিই তার আয়ের উৎস।

যুদ্ধ শুরুর দুই বছর আগে আল আকসা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ থেকে স্নাতক হন আল-আওয়াদি। এরপর চারুকলা ও গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ করতেন তিনি। চেষ্টা করছিলেন প্রদর্শনী ও বিজ্ঞাপনের জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করার। নিজেকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাওয়া আওয়াদি কখনো কল্পনাও করেননি যে একদিন তাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক-দুই শেকেলের বিনিময়ে মানুষের ফোন চার্জ দিতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছর স্টুডিওতে কাটিয়ে নানা শিল্পকর্ম, প্রদর্শনী ও কারুশিল্পে সময় দেওয়া দিনগুলো এখন তার কাছে শুধুই স্মৃতি। যুদ্ধের সময় পরিবারসহ তিনি দেড় বছর দক্ষিণ গাজায় বাস্তুচ্যুত হয়ে ছিলেন। সেখানে শিল্পচর্চা ধরে রাখার চেষ্টা করলেও চারপাশের বোমাবর্ষণ, ধ্বংস ও আতঙ্ক তাকে মনোযোগ দিতে দেয়নি। ইউটিউবে শিল্পীদের কাজ দেখে নিজেকে সচল রাখার চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি ছিল প্রতিকূল।

পরবর্তীতে গাজা সিটিতে ফিরে এসে তিনি দেখেন তার আঁকা ছবি, রং-তুলি ও স্টুডিও সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। তার ঘরটিও পরে বাস্তুচ্যুত স্বজনদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। গোলাবর্ষণে সব কাজ পুড়ে যাওয়ার পর এখন আর পুরনো পেশায় ফিরে যাওয়ার কোনো পথ নেই।

পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য হয়ে তিনি এ নতুন কাজ শুরু করেন। মানুষ তার কাছে ফোন চার্জ দিতে আসে, প্রতি চার্জে এক শেকেল করে নেন। কিন্তু সেটিও পাওয়া কঠিন, কারণ পুরো অঞ্চলে নগদ অর্থের সংকট তীব্র।

আল-আওয়াদির এ পরিবর্তন গাজার বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যুদ্ধের কারণে এখানে ঐতিহ্যগত পেশাগুলো প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে্। তার জায়গায় তৈরি হয়েছে নতুন এক ‘বেঁচে থাকার অর্থনীতি’। ধ্বংসযজ্ঞ, বাস্তুচ্যুতি ও মৌলিক সেবার ভাঙনের ফলে দক্ষ স্নাতকরাও এখন বাধ্য হচ্ছেন অস্থায়ী ও অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হতে।

গবেষক রামি আল জাইঘ বলেন, যুদ্ধ গাজার সমাজকে কয়েক দশক পেছনে ঠেলে দিয়েছে, ফিরে এসেছে পুরোনো পেশা। আবার এমন কাজ তৈরি হয়েছে যা আগে কখনো ছিল না। এ ধরনের অস্থায়ী পেশাগুলো অনেক ফিলিস্তিনিকে ‘নিশ্চিত মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে এনেছে’। এগুলো ন্যূনতম আয় ও মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে।

তিনি আরো বলেন, এসব কাজের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো এর সরলতা—বিশেষ দক্ষতা বা উন্নত সরঞ্জামের প্রয়োজন হয় না। সাধারণত খুবই মৌলিক উপকরণ ব্যবহার করে মানুষ টিকে থাকার চেষ্টা করছে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন উদ্ভাবনও দেখা যাচ্ছে, যেমন সৌরশক্তি দিয়ে ডিভাইস চার্জ করা বা ত্রাণের তালিকা প্রস্তুত করা।

তবে এসব কাজ স্থায়ী নয়, বরং যুদ্ধের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। বোমাবর্ষণ, পুনঃপুন বাস্তুচ্যুতি এবং অস্থিরতার মধ্যে এগুলো চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গাজার অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়েছে—মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ৮৫ শতাংশ কমেছে, বেকারত্ব বেড়ে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রায় পুরো জনগোষ্ঠীই এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। এ বাস্তবতায় সমাজের সব স্তরের মানুষ—পুরুষ, নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, স্নাতক এমনকি উচ্চশিক্ষিতরাও অস্থায়ী অর্থনীতির অংশ হয়ে পড়েছে। প্রয়োজন ও হতাশাই তাদের এ পথে ঠেলে দিচ্ছে।

একই বাজারে ৩২ বছর বয়সী মুস্তাফা বুলবুলও তার ভাইয়ের সঙ্গে ভুট্টা বিক্রি করছেন। ব্যবসা প্রশাসনে ডিগ্রি থাকা এ ব্যক্তি যুদ্ধের আগে একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, কিন্তু এখন সবকিছু হারিয়েছেন। পূর্ব গাজার আল-শুজাইয়া এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তিনি এখন স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে একটি তাঁবুতে বাস করছেন।

তিনি বলেন, যুদ্ধ তার বাড়ি, চাকরি ও পেশা সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগত ও শিক্ষাগত পরিচয়ও হারিয়ে ফেলেছেন। পরিবারের দায়িত্বের কারণে যে কোনো কাজই তাকে করতে হচ্ছে। তিনি জানান, গাজায় এখন ব্যবসা প্রশাসনসংক্রান্ত কাজ প্রায় নেই বললেই চলে। যে কোম্পানিতে তিনি কাজ করতেন সেটি ধ্বংস হয়ে গেছে। হাজারো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এভাবে ধ্বংস হওয়ায় অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

সব প্রতিকূলতার মাঝেও মুস্তাফা টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। তিনি আশা করেন, একদিন আবার তার আগের পেশায় ফিরতে পারবেন, অফিসে কাজ করবেন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবেন।

আরও