আল-জাজিরার প্রতিবেদন

কারাকাসে জেঁকে বসেছে অনিশ্চয়তা-অস্থিরতার ছাপ

ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের কেন্দ্রীয় বাজার কুইন্তা ক্রেসপো। অস্থিরতা ও লুটপাটের আশঙ্কায় বহু ব্যবসায়ী এখাতে তাদের দোকান বন্ধ রেখেছেন। যেসব দোকান খোলা রয়েছে, সেগুলোর বাইরে লম্বা লাইন। দুপুরের তীব্র রোদ উপেক্ষা করেই লাইনে দাঁড়িয়েছেন অনেক মানুষ। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না চলে যায়, সেজন্য অদূরে টহল দিচ্ছে বোলিভারিয়ান ন্যাশনাল পুলিশের সদস্যরা।

ক্রেতারা জানালেন, রাজধানীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে যেন সমস্যা না হয়, সে আশঙ্কা থেকে তারা ভুট্টার আটা, চাল ও ক্যানজাত খাদ্যের মতো দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য পণ্য কিনে রাখছেন।

এমনই একজন ক্রেতা কারাকাসের পশ্চিমাঞ্চলীয় কারিকুয়াও এলাকার বাসিন্দা ৪৫ বছর বয়সী কার্লোস গোদয়। সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ভেনিজুয়েলা যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে আমরা সবাই উৎকণ্ঠায়, অনিশ্চয়তায় আছি। কী হয়, তার অপেক্ষায় আছি। এখন আমি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজছি।’

তিনি জানালেন, গুঁড়া দুধের মতো নিত্যপণ্যের দাম এখন আকাশ ছুঁয়েছে। প্রতি কেজি গুঁড়া দুধের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ ডলারের সমপরিমাণে।

আরেক ক্রেতা বেতসেরপা রামিরেজ জানালেন, শনিবার ভোরের হামলার পরও তিনি এখনো মানসিকভাবে বেশ শান্ত রয়েছেন। ঘরে খাদ্যপণ্য মজুদ করে রাখার কোনো প্রয়োজন আপাতত দেখছেন না তিনি। কিন্তু কারাকাসসহ গোটা ভেনিজুয়েলা জুড়ে বিদ্যমান অস্থিরতা-অনিশ্চয়তার ছাপ যে দ্রব্যমূল্যে পড়েছে, তা অনুভব করতে পারছেন তিনি। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘অপরিহার্য স্বাস্থ্যবিধি সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর দাম বেড়েছে খাবারের চেয়েও বেশি।’

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনিজুয়েলার স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিয়মিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু রাখার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এর পরেও রাজধানী কারাকাসের অনেক দোকানপাট এখন বন্ধ। এর মধ্যেই সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুদ করতে শুরু করেছে অনেক পরিবার।

কারাকাসের ব্যস্ততম কেনাকাটার এলাকাগুলোর একটিতে অবস্থিত সাম্বিল মলের একটি মোবাইল ফোনের দোকানে কাজ করছেন আলেক্সান্দ্রা আরিসমেন্দি নামে এক ভেনিজুয়েলান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ক্ষুব্ধ করে তুলেছে তাকেও। বিশেষ করে ডিমের দামকে ‘অতিরঞ্জিত’ হিসেবে দেখছেন তিনি। আলেক্সান্দ্রা আরিসমেন্দি বলেন, ‘ডিমের দাম খুবই বেশি। এক কার্টন ডিম ১০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে, যা অস্বাভাবিক।’

ওই মোবাইল দোকানের আরেক কর্মী, ২৩ বছর বয়সী মারিয়া গ্যাব্রিয়েলা জানান, দ্রব্যমূল্য বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু বাজারে ক্রেতার সংখ্যা স্বাভাবিকের চেয়ে কম। অস্থিরতার আশঙ্কায় মানুষ ঘরের ভেতরে থাকায় বিক্রি মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

সাধারণত শপিং মলটি স্বাভাবিক দিনগুলোয় ভিড়ে ঠাসা অবস্থায় থাকে। কিন্তু মলটি প্রায় ফাঁকা। গ্যাব্রিয়েলা নিজেও কাজে আসা নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। বিপদের আশঙ্কা থাকায় গণপরিবহন এড়িয়ে ট্যাক্সিতে করে কাজে এসেছেন তিনি। তিনি বলেন,
‘আমরা ভেবেছিলাম বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কায় মানুষ চার্জার বা পাওয়ার ব্যাংকের মতো দ্রব্য খুঁজবে, কিন্তু তারা অন্য জিনিস খুঁজছে। স্বাভাবিক কোনো কার্যক্রমই নেই।’

গত এক দশকে অস্থির মূল্যবৃদ্ধি ও পণ্যের সংকটে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন ভেনিজুয়েলানরা। দেশটির এ অবস্থার জন্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত দুর্নীতি, অপব্যবস্থাপনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করে থাকেন। কিন্তু বর্তমানে দেশটিতে অস্থিরতা-আশঙ্কার মাত্রা অতীতের সব সময়কে ছাড়িয়ে গেছে।

নিকোলাস মাদুরো ক্ষমতায় বসার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম পড়ে গেলে দেশটির জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতি কার্যত ধসে পড়ে। ভেনিজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশটির মূল্যস্ফীতি ১ লাখ ৩০ হাজার শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। কভিড-১৯ মহামারীও অর্থনীতিতে বড় ধরনের অভিঘাত তৈরি করে। ফলে খাদ্য ও স্বাস্থ্যসামগ্রীর সংকট তীব্রতর হয়।

২০২৪ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয় দাবি করার পর থেকে মাদুরো সরকার আর কোনো মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। গত শনিবারের মার্কিন হামলার পর ভেনেজুয়েলায় কবে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ওই দিন ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কারাকাস, আরাগুয়া, মিরান্দা ও লা গুয়ারা অঙ্গরাজ্যের সামরিক স্থাপনায় গোলাবর্ষণ করে। নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ভেনিজুয়েলার এক কর্মকর্তা নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, ওই হামলায় অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে।

আরও