ইসরায়েল গত সপ্তাহে ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে অনলাইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ব্যাপক হারে ছড়ানো হচ্ছে বিভ্রান্তিকর তথ্য। বিবিসি বিশ্লেষণ করে দেখেছে, অসংখ্য ভিডিও ও পোস্ট তৈরি করা হয়েছে যেগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে—তেহরানের সামরিক পাল্টাঘাতকে অতিরঞ্জিত করে তুলে ধরা। অন্যদিকে, কিছু ভুয়া ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে—ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার ভয়াবহ পরিণতি। বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, তারা যে তিনটি ভুয়া ভিডিও শনাক্ত করেছে, সেগুলো একত্রে ১০ কোটিরও বেশি বার দেখা হয়েছে বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে।
এদিকে, ইসরায়েলপন্থী অ্যাকাউন্টগুলোও অনলাইনে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়েছে। পুরনো প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ভিডিও নতুন করে শেয়ার করে দাবি করা হয়েছে, ইরানের জনগণ এখন সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করছে। এআই দিয়ে তৈরি একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়—তেহরানের রাস্তায় ইরানিরা ‘উই লাভ ইসরায়েল’ স্লোগান দিচ্ছে। ভিডিওটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও তা পুরোপুরি ভুয়া।
টুইটারে জিওকনফার্মড নামে একটি যাচাইকরণ সংস্থা লিখেছে, ‘আমরা এমন ভিডিও দেখছি যেগুলো পাকিস্তানের, আবার কিছু ২০২৪ সালের অক্টোবরের পুরনো হামলার দৃশ্য। এমনকি কিছু ভিডিও গেমের ক্লিপ কিংবা পুরোপুরি এআই-জেনারেটেড, যেগুলোকে বাস্তব দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে।‘
কিছু অ্যাকাউন্ট এখন বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে বিশালসংখ্যক অনুসারী বাড়িয়ে নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘ডেইলি ইরান মিলিটারি’ নামে একটি ইরানপন্থী অ্যাকাউন্টের ফলোয়ার সংখ্যা ১৩ জুন ছিল ৭ লাখের কিছু বেশি। সে সংখ্যাই ১৯ জুনের মধ্যে বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ লাখে। মাত্র ছয় দিনেই অ্যাকাউন্টটিতে ফলোয়ার বেড়েছে ৮৫ শতাংশেরও বেশি। তেহরান সরকারের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি অ্যাকাউন্টটির।
বিবিসি ভেরিফাইকে ‘গেট রিয়েল’ নামের বিশ্লেষক গোষ্ঠীর প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা ইমানুয়েল সালিবা বলেন, ‘কোনো সংঘাতে এবারই এত বড় পরিসরে এআই ব্যবহার হতে দেখলাম।‘
এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি ২৭ মিলিয়ন বার দেখা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে—তেল আবিব শহরের ওপর একযোগে বহু ক্ষেপণাস্ত্র ফেলা হচ্ছে। আরেকটি ভিডিওতে রাতের আঁধারে ইসরায়েলের একটি ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দৃশ্য দেখা যায়। সালিবার মতে, রাতের দৃশ্য দেখালে সেগুলোর সত্যতা যাচাই আরো কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি ইসরায়েলের অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ধ্বংস করার দাবিকে ঘিরেও নানা এআইভিত্তিক ভুয়া ক্লিপ ছড়ানো হচ্ছে। ‘আলিথিয়া’ বিশ্লেষক সংস্থার প্রধান নির্বাহী লিসা কাপলান জানিয়েছেন, যদি এসব ভিডিও সত্য হতো, তাহলে ইরানের হামলায় ইসরায়েলের এফ-৩৫ বিমানের প্রায় ১৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে যেত। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণিত ভিডিও পাওয়া যায়নি যেখানে সত্যিই একটি এফ-৩৫ ধ্বংস হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এক ভাইরাল পোস্টে দাবি করা হয়, ইরানের মরুভূমিতে একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে। কিন্তু ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেখানে স্পষ্ট এআই সম্পাদনার চিহ্ন রয়েছে। যেমন— জেট বিমানের আশপাশের সাধারণ মানুষ ও যানবাহনের আকার ছিল প্রায় একই এবং বালিতে কোনো ধ্বংসের চিহ্নই দেখা যায়নি।
টিকটকে ২ কোটি ১১ লাখ বার দেখা একটি ভিডিওতে দাবি করা হয়, একটি ইসরায়েলি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ইরানের বিমান প্রতিরক্ষায় ধ্বংস হয়েছে। কিন্তু এটি ছিল আসলে একটি ফ্লাইট সিমুলেটর ভিডিও গেমের দৃশ্য। বিবিসি ভেরিফাই কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে টিকটক ভিডিওটি সরিয়ে নেয়।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা চালাতে পারে এমন জল্পনার পর কিছু অ্যাকাউন্ট এখন তেহরানের আকাশে মার্কিন বি-২ বোমারু বিমানের এআই দিয়ে তৈরি ছবি পোস্ট করা শুরু করেছে।
চলমান এআই-চালিত তথ্যযুদ্ধ এবং ভুয়া ভিডিওর ছড়াছড়িতে এবার জড়াচ্ছে রাষ্ট্রীয় মাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ইরান এবং ইসরায়েল—দুই দেশের সরকারি সূত্রও ভুয়া কনটেন্ট ছড়ানোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
ইসরায়েলি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের একটি ‘ধ্বংসাবশেষ’ দেখিয়েছে তেহরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। সেটাও এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ছবি। অন্যদিকে, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) শেয়ার করা এক ভিডিওতে ব্যবহার করা হয়েছে পুরনো ও সম্পর্কহীন ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফুটেজ।
বেশিরভাগ বিভ্রান্তিকর পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে এক্স প্ল্যাটফর্মে। অনেক ব্যবহারকারী সেখানে প্ল্যাটফর্মের নিজস্ব এআই চ্যাটবট ‘গ্রোক’-এর সহায়তায় সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিতর্ক তৈরি হয়েছে তখনই, যখন গ্রোক নিজেই বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।
একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়ের গায়ে গড়া কোনো বিশাল বাংকার থেকে অনবরত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী ট্রাক বেরিয়ে আসছে। ভুয়া ভিডিওটি বিশ্লেষণ করে ‘গেট রিয়েল’ প্রতিষ্ঠানের ইমানুয়েল সালিবা বলেন, ‘ভিডিওতে পাথর নিজে নিজেই নড়ছে, যা এআই এডিটিংয়ের স্পষ্ট লক্ষণ।‘
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ভিডিও ছড়ানোর পেছনে অনেক সময় কোনো রাষ্ট্রীয় বা সাংগঠনিক উদ্দেশ্য না থাকলেও সাধারণ ব্যবহারকারীরাই রাজনৈতিক পক্ষপাত বা আবেগতাড়িত হয়ে এগুলো শেয়ার করছে।
নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ম্যাথিউ ফাচিয়ানি বলেন, ‘রাজনীতি বা যুদ্ধ নিয়ে মানুষ যখন দ্বিমুখী মতবিভাজনের মধ্যে পড়ে তখন তারা এমন কনটেন্টই শেয়ার করতে চায়, যা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে সমর্থন করে। তার ওপর, আবেগপ্রবণ বা অতিরঞ্জিত কনটেন্টই সাধারণত অনলাইনে দ্রুত ছড়ায়।‘