ইরান যুদ্ধ

দ্রুত জয় অধরা, সাফল্যের মানদণ্ড খুঁজতে হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প

ইরান-বিরোধী দলগুলোকে যে বড় বড় স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন এখন সুদূরপরাহত মনে হচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তায় এখন স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। তিনি কখনও বলছেন যুদ্ধ কয়েক দিনে শেষ হবে, আবার কখনও পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এই দোদুল্যমানতা প্রমাণ করে যে, হোয়াইট হাউসের কাছে এই সংকটের কোনো সুনির্দিষ্ট 'এক্সিট স্ট্র্যাটেজি' বা প্রস্থানের পথ নেই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রণকৌশল বরাবরই 'অপ্রত্যাশিত' হামলার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তবে ইরানের ক্ষেত্রে তার এই চিরচেনা ছক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার মতো চরম উত্তেজনাকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন একটি 'দ্রুত বিজয়' বা 'কুইক উইন' আশা করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, শীর্ষ নেতৃত্বের পতনে তেহরান হয়তো ভেঙে পড়বে এবং দ্রুত আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করবে। কিন্তু বাস্তবতা তার উল্টো। ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা কয়েক দশকের পুরোনো এবং এর ক্ষমতা কাঠামো এতটাই গভীরে প্রোথিত যে, কেবল বিমান হামলা বা শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে একে রাতারাতি বদলে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না।

শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়া এবং তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে মার্কিন বোমাবর্ষণ যতটা শোরগোল তুলেছে, ততটা রাজনৈতিক সাফল্য এনে দিতে পারেনি। ইরানি নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—এ মুহূর্তে তারা কোনো আলোচনায় ফিরছে না।

বিপরীতে, ইরান নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রদর্শন বাড়িয়ে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর, এমনকি বেসামরিক এলাকায়ও হামলা চালাচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেকোনো জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি দিয়ে তারা বোঝাতে চাইছে, তারা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং আলোচনায় বসার আগে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করা তাদের কাছে অপরিহার্য। তেহরানের এই অনড় অবস্থানের মূল কারণ হলো, তারা কোনো প্রকার 'প্রতিরোধ ক্ষমতা' তৈরি না করে আলোচনায় বসতে নারাজ। তারা মনে করছে, এখনই যদি তারা নতি স্বীকার করে, তবে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল আরো ছোটখাটো অজুহাতে বারবার হামলা চালাবে। ফলে ইরানের এই 'ফাইট ব্যাক' কৌশল ট্রাম্পের জন্য এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, কারণ তিনি ঐতিহাসিকভাবে এমন যুদ্ধে জড়াতে চান না যা দীর্ঘ সময় ধরে চলে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বার্তায় এখন স্পষ্ট অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। তিনি কখনও বলছেন যুদ্ধ কয়েক দিনে শেষ হবে, আবার কখনও পাঁচ সপ্তাহেরও বেশি সময়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন। এই দোদুল্যমানতা প্রমাণ করে যে, হোয়াইট হাউসের কাছে এই সংকটের কোনো সুনির্দিষ্ট 'এক্সিট স্ট্র্যাটেজি' বা প্রস্থানের পথ নেই। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, তিনি তখনই সামরিক শক্তি ব্যবহার করেন যখন জয়টা নিশ্চিত এবং সহজ হয়। যেমনটি গত বছর হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযানে দেখা গিয়েছিল—যখনই বোঝা গেল জয় সহজ নয়, তিনি দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিলেন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের অর্থ হলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মিত্রদের ওপর বড় ধরনের ঝুঁকি এবং তেলের বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা।

সবশেষে, ট্রাম্প হয়তো খামেনির মৃত্যু বা তেহরানের ধ্বংসলীলার ছবি দেখিয়ে ঘরোয়া রাজনীতিতে নিজেকে বিজয়ী হিসেবে জাহির করার চেষ্টা করবেন। কিন্তু এর পেছনে যে মানবিক বিপর্যয় এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই সফলতার সংজ্ঞায় পড়ে না। বিশেষ করে ইরান-বিরোধী দলগুলোকে যে বড় বড় স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন এখন সুদূরপরাহত মনে হচ্ছে। ট্রাম্পের এই 'বিজয়' খোঁজার মরিয়া চেষ্টা শেষ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যকে এক অনন্ত বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে প্রকৃত শান্তি বা স্থিতিশীলতা কেবল একটি অলীক কল্পনা হয়েই থেকে যাবে।

আল জাজিরা অবলম্বনে

আরও