গাজায় অপুষ্টির মহামারি

‘তাঁবুতে বসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি'

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মাইকেল রায়ান বলেন, ‘আমরা গাজার শিশুদের দেহ ও মন গুঁড়িয়ে দিচ্ছি। এ অবস্থা চলতে থাকলে, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই ট্র্যাজেডিতে আমরাও দোষী হয়ে থাকব।‘

ইসরায়েলের টানা অবরোধে গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। টানা তিন মাস ধরে গাজার সীমান্ত বন্ধ ও খাদ্যসাহায্য আটকে যাওয়ায় চরম ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে হাজার হাজার শিশু। জাতিসংঘ সতর্ক করেছে, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে হাজারো শিশুর জীবন বিপন্ন হবে। খবর এপি।

গাজার দক্ষিণাঞ্চলের নাসের হাসপাতালের শিশুবিভাগে ভর্তি ৯ মাস বয়সী খালেদ তার মায়ের কোলে নিস্তেজ পড়ে আছে। ওজন মাত্র ৫ কেজি—স্বাভাবিকের অর্ধেক। তার মা ওয়েদাদ আবদেলআল বলেন, ‘সে ক্ষুধায় কাঁদে, দুধের জন্য কাতরায়, কিন্তু হাসপাতালেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই।‘

ওয়েদাদ বলেন, ‘আমরা বাঁচার মতো অবস্থায় নেই। সন্তানদের মুখে কিছু তুলে দিতে পারি না। আমরা কেবল তাঁবুতে বসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি।‘

খালেদের মা নিজেও অপুষ্টিতে ভুগছেন। সন্তানকে বুকের দুধ দেয়ার শক্তি নেই। ‘দাঁত পড়ে যাচ্ছে, শরীরে ক্যালসিয়াম নেই। খাওয়ার মতো কিছু নেই, দুধও তৈরি হয় না,’ বলেন ওয়েদাদ।

অবরোধের ফলে গাজায় খাদ্য, পানি, জ্বালানি এবং চিকিৎসাসামগ্রীর প্রবেশ কার্যত বন্ধ। জাতিসংঘ জানিয়েছে, শুধু মার্চ মাসেই ৩,৬০০ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়েছে। যা ফেব্রুয়ারির তুলনায় ৮০ শতাংশ বেশি। এই সংকট এখন আর কেবল যুদ্ধ নয়, এটি একটি শিশুদের বিরুদ্ধে নীরব গণহত্যা।

নাসের হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. ইয়াসের আবু ঘালি বলেন, ‘আমরা শুধু গুরুতর অবস্থা দেখে শিশু ভর্তি করছি, কারণ হাসপাতালের শয্যা সংখ্যাই নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিছুই করার নেই।‘

৭ বছরের আহমেদ ও ৪ বছরের মারিয়াও অপুষ্টিতে কঙ্কালসার। আহমেদের ওজন মাত্র ৮ কেজি। ফিডিং সেন্টারগুলো ৬ বছরের নিচের শিশুদেরই শুধু সহায়তা দিচ্ছে, ফলে তাদের কোনো চিকিৎসা নেই। বাজারে খাবারের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এক কেজি টমেটো বা আলুর দাম ২১ ডলার পর্যন্ত উঠেছে। বিস্কুটের দাম ২ ডলার, আর স্যাডিনের একটি ক্যানের দাম প্রায় ১০ ডলার।

ইসরায়েল বলছে, তারা হামাসকে চাপ দিতে এবং জিম্মিদের মুক্তির জন্য এই অবরোধ জারি রেখেছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এটি যুদ্ধের একটি কৌশল হিসেবে খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার সামিল। গাজায় বর্তমানে ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ সাহায্যনির্ভর, কিন্তু জাতিসংঘের গুদামে খাদ্য ফুরিয়ে গেছে, বাজার শূন্য, এবং অনেক কমিউনিটি কিচেন বন্ধ হয়ে গেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি বিভাগের নির্বাহী পরিচালক মাইকেল রায়ান বলেন, ‘আমরা গাজার শিশুদের দেহ ও মন গুঁড়িয়ে দিচ্ছি। এ অবস্থা চলতে থাকলে, চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এই ট্র্যাজেডিতে আমরাও দোষী হয়ে থাকব।‘

আরও