পুড়ছে বন, শুকিয়ে যাচ্ছে নদী— চাপের মুখে ইউরোপের রাজনীতিকরা

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর প্রাথমিক হিসাব অনুসারে, এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ইউরো। তবে প্রকৃত ক্ষতির পুরো হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের ব্যয়ও সবে শুরু হয়েছে

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েন চলতি বছরের গ্রীষ্মকে বলেছিলেন ‘সামার অব ট্রুথ’। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবার ইউরোপসহ উত্তর গোলার্ধজুড়ে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে, মাঠের ফসল পুড়েছে, দাবানলে বন ধ্বংস হয়েছে, নদী ও জলাধার শুকিয়ে গেছে। তাপে রেললাইন বেঁকে গেছে, সড়ক গলে গেছে এবং শুধু ইউরোপেই প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ মারা গেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর প্রাথমিক হিসাব অনুসারে, এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৮০ বিলিয়ন ইউরো। তবে প্রকৃত ক্ষতির পুরো হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি। ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ায় খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। একইসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের ব্যয়ও সবে শুরু হয়েছে।

ইইউর পরিস্থিতি নিয়ে দেয়া ভাষণে গত সপ্তাহে ফন ডার লিয়েন বলেন, ‘এগুলো শুধু একটি পূর্বাভাস।’ তিনি বলেন, এবারের গ্রীষ্ম ছিল ইতিহাসের উষ্ণতম। তবে সামনের বছরগুলোর তুলনায় এটিই সম্ভবত সবচেয়ে শীতল গ্রীষ্ম হতে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক তথ্য স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ গতিতে উষ্ণ হচ্ছে ইউরোপ।

তবে শুধু ইউরোপই নয়, বিশ্বের কোনো অঞ্চলই জলবায়ু সংকটের প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রে এ বছরের গ্রীষ্মের তাপমাত্রা ১৯৩০-এর দশকের ‘ডাস্ট বোল’ সময়কালের তীব্রতাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বসন্ত থেকেই দেশটির ৬০ শতাংশ এলাকা খরার কবলে পড়েছে, যা বছরের এই সময়ের জন্য রেকর্ড। এশিয়াজুড়ে অতিবৃষ্টিতে আকস্মিক বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবেশকর্মীদের মতে, মধ্যপন্থী ও বামপন্থী রাজনীতিকদের প্রতিক্রিয়া সর্বোচ্চ হলেও যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিকদের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারের প্রবণতা আরো জোরালো হয়েছে।

গ্রিনপিসের ইইউ কর্মসূচির পরিচালক ম্যাগদা স্তচকিয়েভিচ বলেন, ‘এটি ছিল সবচেয়ে উষ্ণ গ্রীষ্ম, কিন্তু প্রতিক্রিয়া ছিল সবচেয়ে দুর্বল।’ তার অভিযোগ, ইইউ কমিশন পরিবেশগত উদ্যোগের অর্থায়ন কমানোর পরিকল্পনা করছে এবং গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানিকে সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।

তবে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। ফন ডার লিয়েন কম-কার্বন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ইউরোপে নতুন ধরনের বিদ্যুৎনির্ভরতা এবং তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় প্রস্তুতি বাড়ানোর কথা বলেছেন। নেদারল্যান্ডস জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে। ফ্রান্স বিদ্যুতায়ন দ্রুত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। যুক্তরাজ্যও কমিউনিটি এনার্জি কর্মসূচিতে প্রাথমিক অর্থ বরাদ্দ করেছে।

উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেও থাইল্যান্ড গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইন্দোনেশিয়া সৌরবিদ্যুৎ বাড়াচ্ছে। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৫০০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়েছে। চীনে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি (ইভি) এবং সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের প্রসারের কারণে এ বছর কার্বন নিঃসরণ কমতে পারে।

তবে এসব পদক্ষেপের বিপরীতে অনেক সরকার জলবায়ু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখাচ্ছে বা জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। যুক্তরাজ্য নতুন জ্বালানি তেল ও গ্যাসক্ষেত্র খননের কথা বিবেচনা করছে, জার্মানি নতুন গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করছে এবং ফ্রান্স গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে পিছিয়ে পড়ছে।

জলবায়ু সংকটের প্রভাব মোকাবেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোও ঋণের চাপে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছে না। আফ্রিকার পাওয়ার শিফট থিংকট্যাংকের পরিচালক মোহামেদ আদো বলেন, অনেক দেশকে বিপুল ঋণ পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগে জীবন রক্ষাকারী অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মধ্যে একটি বেছে নিতে হচ্ছে।

তবে জরিপ বলছে, জলবায়ু নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমেনি। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তারা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের বাস্তবতা স্বীকার না করলে তারা মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন। ইউরোপের ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন ও যুক্তরাজ্যেও এবারের রেকর্ড তাপমাত্রার পর জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের প্রধান পাঁচটি উদ্বেগের একটি হয়ে উঠেছে।

দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপিত

আরও