সেপ্টেম্বরের এক সকালে ইসরায়েলি হামলার মুখে দক্ষিণ লেবাননের গ্রাম থেকে পালাতে বাধ্য হন জয়নাব দাহের ও তার পরিবার। ইসরায়েলি গোলাবর্ষণ তখন এতটাই তীব্র আকার ধারণ করেছিল যে, শুধু প্রয়োজনীয় জিনিস গুটিয়েই বৈরুতের উদ্দেশে রওনা হন তারা। সেখানে পৌঁছাতে লেগেছিল দীর্ঘ ১৩ ঘণ্টা। কিন্তু বৈরুতে এসেও গোলাবর্ষণ থেকে রেহাই পাননি। সেই থেকেই চলছে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে পালিয়ে বেড়ানোর চক্র।
নভেম্বরে মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও আতঙ্ক কাটেনি। লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে। দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগত কিছু অংশে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণও রয়েছে। একদিকে হিজবুল্লাহ লক্ষ্যবস্তুতে চলছে ইসরায়েলি বিমান হামলা, অন্যদিকে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলি দাবি মেনে অস্ত্র জমা করতে নারাজ। ফলে ফের সংঘর্ষের আশঙ্কা নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন জয়নাব ও আরো হাজারো মানুষ। প্রায় ৯০ হাজার লেবানিজ এখনো নিজ গ্রামে ফিরতে পারেননি। এই প্রেক্ষাপটে দেশটির মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এখন আর উপেক্ষা করার মতো নয়।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লেবাননের দক্ষিণ সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (পিটিএসডি) ও সাইকোসোম্যাটিক লক্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। তবে চিকিৎসা খরচ এত বেশি যে মানসিক চিকিৎসা এখন বিলাসবহুল সেবা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি থেরাপি সেশন ৪০ থেকে ১০০ ডলার।
সমস্যা থেকে উত্তোরণে মানসিক আশ্রয় হিসেবে এআই চ্যাটবটের সাহায্য নিচ্ছেন ভুত্তভোগীরা। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা বেড়েছে। তারা এতে নিজেদের কথাগুলো বলছে, সান্ত্বনা খুঁজছে, এমনকি মানসিক রোগের সম্ভাব্য নাম জানতে চাচ্ছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, চ্যাটজিপিটি মানুষের মতো আবেগ-অনুভূতির প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না। এর মাধ্যমে সঠিক চিকিৎসা বিলম্বিত হতে পারে, মানুষ ভুল ভেবে বসতে পারে যে তারা সুস্থ হয়ে উঠছে—আসলে নয়।
জয়নাবের অভিজ্ঞতাও তেমনই। ফেসবুকে একটি পোস্ট দেখে তিনি চ্যাটজিপিটি-তে নিজের মানসিক অবস্থার সেলফ টেস্ট করেন। বট তাকে জানায়, তার পিটিএসডি, স্কিৎজোফ্রেনিয়া ও এডিএইচডি থাকতে পারে। থেরাপি নেয়ার সামর্থ্য না থাকায় চ্যাটজিপিটির কাছেই আশ্রয় নেন জয়নাব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, সংঘাতপীড়িত এলাকায় প্রতি পাঁচজন মানুষের মধ্যে একজন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এর মধ্যে রয়েছে হালকা বিষণ্নতা থেকে শুরু করে তীব্র উদ্বেগ, মানসিক অবসাদ ও মনোরোগ ।
লেবাননের পরিস্থিতি আরো করুণ। খাবার আর বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণই সেখানে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রান্তিক ও গ্রামীণ অঞ্চলে সরকারি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও প্রায় নেই বললেই চলে। এই প্রেক্ষাপটে বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। অনেকেই মানসিক কষ্ট কমাতে ব্যবহার করছেন চ্যাটজিপিটি ও অন্যান্য এআই চ্যাটবট।
দক্ষিণ সীমান্তবর্তী শহর আল-আদাইসার ২২ বছর বয়সী ফ্যাশন উদ্যোক্তা সারাহ রাম্মাল ইসরায়েলি বাহিনীর আগুনে নিজের বাড়ি ও ছোট ব্যবসা হারিয়েছেন। এখন বৈরুতে একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন, সবকিছু নতুন করে শুরুর চেষ্টা করছেন। নিজের মানসিক অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে সারাহ বলেন, মনে হয় আমার জীবনটাই মুছে গেছে। রাতের পর রাত শুধু চ্যাটজিপিটির সঙ্গে কথা বলতাম—ব্যথা লাঘবের জন্য। প্রথমে এআই চ্যাটবটের সঙ্গে আলাপ তাকে এক ধরণের মুক্তি দিত। কারও সঙ্গে কথা বলার চেয়ে সহজ লাগত।
কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, এটি তার মানসিক উন্নয়নে কোনো সহায়তা করছে না। তিনি একই কষ্টের বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছেন, সামনে এগোতে পারছেন না। অবশেষে তিনি একজন মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শদাতার শরণাপন্ন হন। মাত্র এক সেশনেই কিছুটা হালকা অনুভব করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই কখনোই একজন পেশাদার থেরাপিস্টের বিকল্প হতে পারে না। লেবাননের মতো একটি সংকটগ্রস্ত দেশে, চ্যাটজিপিটি কখনো মানসিক পুনর্বাসনের উপায় হতে পারে না। এটি শুধু একটি ভার্চুয়াল বিরামচিহ্ন, স্থায়ী সমাধান নয়।
এই সমস্যা মোকাবিলায় এমব্রেস ও লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় মিলে ‘স্টেপ-বাই-স্টেপ’ নামে একটি মানসিক স্বাস্থ্য অ্যাপ চালু করেছে, যা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টদের তৈরি।
আল জাজিরা অবলম্বনে