মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর এখন পর্যন্ত জি৭ জোটভুক্ত দেশগুলোর ঘাড়ে চেপেছে ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ঋণ বাবদ বাড়তি ব্যয়ের বোঝা। এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) শেষ নাগাদ বাড়তি ব্যয় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছতে পারে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিভিন্ন সরকারের বন্ড ইস্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করে বাড়তি ঋণ ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, জি৭-এর প্রায় সব দেশেই বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি বন্ডের ইল্ড ফেব্রুয়ারির তুলনায় এখন বেশি। ফলে নতুন করে ঋণ নিতে সরকারগুলোর বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বাড়তি ঋণ ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ বহন করছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ হাজার ৬০ কোটি ডলার। জি৭-ভুক্ত দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি সবচেয়ে বড়। দেশটির সরকারি বন্ডের বাজারও বিশ্বের বৃহত্তম। ফলে ইল্ড বাড়ার প্রভাবও দেশটির ওপর বেশি পড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিকের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত সুদ বাবদ ব্যয় আরো ২ হাজার ১৭০ কোটি ডলার বাড়তে পারে ধারণা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড ইল্ড দ্রুত বেড়েছে। এর পেছনে রয়েছে দেশটির বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়ার আশঙ্কাও কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট দীর্ঘমেয়াদি বন্ড কেনার মাধ্যমে ইল্ড কম রাখার চেষ্টা করলেও এর উত্থান থামেনি।
তবে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়। যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি ও জাপানের মতো বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশও চাপে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট তৈরি হয়েছে জ্বালানি সরবরাহে। এতে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে এসব দেশের বন্ডের ইল্ডেও।
এফটির হিসাবে, ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের বাড়তি ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে যুদ্ধ শুরুর আগের ইল্ডের সঙ্গে বর্তমান ঋণ ব্যয়ের তুলনা করে। আর ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছে বিভিন্ন দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বন্ড ইস্যু পরিকল্পনার ভিত্তিতে। কোন দেশে কোন মেয়াদের কত বন্ড ইস্যু হবে, সে তথ্যও হিসাবের মধ্যে নেয়া হয়েছে।
জেফরিজের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ মোহিত কুমার বলেন, ‘সুদহার বাড়া শেয়ার ও ঋণবাজারের জন্য বড় ঝুঁকি।’ তার মতে, সুদহার আরো বাড়লে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড ৫ শতাংশের ওপরে উঠলে শেয়ারবাজারে চাপ বাড়তে পারে।
বন্ডের ইল্ড বাড়লে শেয়ারের তুলনায় বন্ডের আকর্ষণ বাড়ে। একই সময়ে কোম্পানিগুলোর ঋণ নেয়ার খরচও বেড়ে যায়। এতে মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে উচ্চ ইল্ড শুধু সরকারি অর্থ ব্যবস্থার জন্য নয়, বেসরকারি খাত ও শেয়ারবাজারের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন বাজেট ঘাটতিও বাড়ছে। সরকারগুলো অর্থনীতিতে ব্যয় বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রতিরক্ষা খাতের ব্যয়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ। এসব কারণে সরকারের অর্থের চাহিদা বাড়ছে। ফলে ঋণের বাজারে চাপ আরো বাড়তে পারে।
পিটারসন ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট অ্যাডাম পোসেনের মতে, মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়েও ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জাপান ও যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও বন্ডের ইল্ডে প্রভাব ফেলতে পারে। এর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা যুক্ত হলে ঝুঁকি আরো বাড়বে।
প্রতিরক্ষা, জনসংখ্যাগত চাহিদা, অবকাঠামো ও সবুজ বিনিয়োগে ব্যয় বাড়ায় দীর্ঘমেয়াদে সুদহার বাড়তে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ। সম্পতি বিপুল অর্থ যাচ্ছে এআই অবকাঠামো তৈরিতে। এতে সরকারি বন্ডের মতো অন্যান্য বিনিয়োগ মাধ্যমের জন্য অর্থের জোগান কমে যেতে পারে। ফলে বন্ডের ইল্ডের ওপর আরো ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইএনজির প্রধান বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদ জেমস নাইটলির মতে, বাড়তি ঋণ ব্যয় শুধু সরকারি অর্থ ব্যবস্থার জন্য সমস্যা নয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটি এরই মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলছে। কারণ পরিবার ও কোম্পানির ঋণ নেয়ার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। দেশটির আবাসন বাজারও স্থবির হয়ে পড়েছে। ইল্ডের ব্যবধান বাড়তে থাকলে বন্ধকি ঋণের সুদ ৭ শতাংশের ওপরে উঠতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ইল্ডের উত্থানকে দীর্ঘস্থায়ী প্রবণতা হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন মরগ্যান স্ট্যানলির ইউরোপীয় রেট কৌশল বিভাগের প্রধান জিয়ানলুকা সালফোর্ড। সব মিলিয়ে বন্ড ইল্ডের সাম্প্রতিক উত্থান এখন জি৭ দেশগুলোর জন্য নতুন আর্থিক চাপ তৈরি করছে। যুদ্ধ ও মূল্যস্ফীতির ঝুঁকির সঙ্গে বাড়ছে সরকারি ঋণ। একই সময়ে এআই ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে ঋণ ও বিনিয়োগের অর্থের চাহিদা-জোগানের পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে ইল্ড আরো বাড়লে সরকারি ঋণ ব্যয়ের পাশাপাশি ব্যবসা ও বিনিয়োগেও এর প্রভাব পড়তে পারে।