ইরান-ইসরায়েল সংঘাত

‘এটা তোমাদের নয়’, আশ্রয়কেন্দ্রে ফিলিস্তিনিদের জায়গা দিল না ইসরায়েলি প্রতিবেশী

যে যুদ্ধ চলছে তা কেবল আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যুদ্ধ নয়—তা একটি সামাজিক ও মানবিক বিভাজনেরও প্রতিচ্ছবি।

সামার বলেন, ‘তিনি আমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন। আমি তো হিব্রু ভাষাও ভালোই জানি। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, বললাম আমাদের ভয় লাগছে। কিন্তু তিনি তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু বললেন, ‘এটা তোমাদের জন্য নয়।‘

ইরান থেকে ইসরায়েলে তখন ছোড়া হচ্ছে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র। সাইরেনের শব্দে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া দেশটির শহরগুলোতে মানুষ প্রাণভয়ে ছুটে যাচ্ছিল আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। কিন্তু সেই আশ্রয়কেন্দ্রের দরজা খুলে দেয়া হয়নি ইসরায়েলে বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি নাগরিকের জন্য, যারা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ। চরম বিপর্যয়ের মুখেও সেখানে বাসা বেধেছে বৈষম্য। খবর আল জাজিরা।

ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অনেকে ইসরায়েলের স্বীকৃত সীমানার মধ্যে থাকা শহর, গ্রাম ও পাড়াগুলোতে বসবাস করেন। কিন্তু ইরান-ইসরায়েল চলমান সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ রাতগুলোর একটিতে তারা বঞ্চিত হয়েছেন সেই জীবনরক্ষাকারী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থেকে।

২৯ বছর বয়সী সামার আল-রাশেদ একজন সিঙ্গেল মাদার। তিনি তার পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে জিহানকে নিয়ে থাকেন ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের আক্র শহরের কাছাকাছি একটি ইহুদি অধ্যুষিত অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে।

গত শুক্রবার রাতে সাইরেন বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তিনি মেয়েকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ছুটে যান ভবনের বোমা আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে। সামার বলেন, ‘আমি কিছুই গোছাতে পারিনি। শুধু এক বোতল পানি, ফোন আর মেয়ের হাতটা ধরে দৌড়েছিলাম।‘

নিজের মনে তীব্র ভয় থাকা সত্ত্বেও দৌড়াতে দৌড়াতে সামার তার মেয়েকে সাহস জোগাচ্ছিলেন। আশপাশের অন্যান্য প্রতিবেশীরাও নিচে নেমে আসছিলেন সে সময়। কিন্তু আশ্রয়কেন্দ্রের দরজায় গিয়ে ঘটে ভয়াবহ এক ঘটনা। সামার জানান, একজন ইসরায়েলি প্রতিবেশী তাকে আরবিতে কথা বলতে শুনেই আশ্রয়কেন্দ্রের দরজা আটকে দেন।

সামার বলেন, ‘তিনি আমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন। আমি তো হিব্রু ভাষাও ভালোই জানি। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, বললাম আমাদের ভয় লাগছে। কিন্তু তিনি তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুধু বললেন, ‘এটা তোমাদের জন্য নয়।‘

সেই মুহূর্তে সামার বুঝতে পারেন, যে যুদ্ধ চলছে তা কেবল আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার যুদ্ধ নয়—তা একটি সামাজিক ও মানবিক বিভাজনেরও প্রতিচ্ছবি।

ফিরে এসে যখন তিনি মেয়েকে নিয়ে তার ফ্ল্যাটে উঠে যান। জানালা দিয়ে দেখতে পান আকাশে বিস্ফোরণ আর মাটিতে আঘাত হানছে ক্ষেপণাস্ত্র। সেই দৃশ্য যেমন ভয়াবহ, তেমনি ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তার আশপাশের মানুষজনও।

ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকরা বহুদিন ধরেই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছেন।চাকরি, বাসস্থান, শিক্ষা ও জরুরি সেবা সব ক্ষেত্রেই চলছে এ বৈষম্য। নাগরিকত্ব থাকলেও তারা প্রায়ই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণের মুখোমুখি হন। যুদ্ধের সময় এই বৈষম্য আরো প্রকট হয়ে ওঠে। হাইফা, লোড এবং আক্রের মতো মিশ্র জনগোষ্ঠীর শহরগুলোতে বহু ফিলিস্তিনি আশ্রয় চাইলেও ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে, শুধুমাত্র আরব পরিচয়ের কারণে।

এই ঘটনা ইসরায়েলি সমাজে বসবাসরত সংখ্যালঘু ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বাস্তবতা আবারও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। তারা রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্ব পেলেও প্রতিনিয়তই নিগ্রহ, বঞ্চনা এবং বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছেন—এমনকি যুদ্ধ ও বিপদের মুহূর্তেও।

আরও