কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পরিবারের সঙ্গে এক দশক ধরে বসবাস করছিল ১৫ বছর বয়সী জানি আলম। গত জুনের শুরুতে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে অপহরণ করা হয়। দুই মাস পর জোর করে মালয়েশিয়াগামী একটি নৌকায় তোলা হয়। শেষবার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় কাঁদতে কাঁদতে বিষয়টি জানায় জানি আলম।
তার বাবা আবদুল নুর বলেন, অপহরণকারীরা মুক্তিপণ হিসেবে প্রায় ২ হাজার ৮০০ ডলার দাবি করেছিল। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সেই অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ছেলেকে আর ফিরে পাননি। নুরের ধারণা, জুলাইয়ে মিয়ানমারের উপকূলের কাছে নিখোঁজ হওয়া দুটি নৌকার একটিতে থাকা তার ছেলেও ছিল। ওই বিপজ্জনক যাত্রায় অংশ নেয় ৫০০ জনের মতো মানুষ।
জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক এ সমুদ্রপথে যাত্রা করা প্রতি সাতজনের একজন গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না। গত বছর বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগরে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী যাত্রা করেছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন নিখোঁজ বা নিহত হন। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, শরণার্থী ও অভিবাসীদের সমুদ্রযাত্রার ক্ষেত্রে এটিই বিশ্বের সর্বোচ্চ মৃত্যুহারের রুট।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সমুদ্রে ৮২০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। জুনের শেষ নাগাদ প্রায় ৫ হাজার ৭০০ জন এ পথে যাত্রায় অংশ নিয়েছেন, এটি পুরো ২০২৫ সালের সংখ্যার কাছাকাছি। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে, কারণ অনেক যাত্রার খবরই জানা যায় না এবং অনেক নৌকা খবরের আড়ালেই ডুবে যায়।
ছবি: রয়টার্স
গত কয়েক বছরে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোর অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে এ ধরনের সমুদ্র যাত্রা বেড়েছে। পুরোনো মাছ ধরার ট্রলারের গাদাগাদি করা কার্গো হোলে নারী ও শিশুসহ হাজারো রোহিঙ্গা বাংলাদেশ বা মিয়ানমার থেকে বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর পাড়ি দিয়ে ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করেন। আর তাদের লক্ষ্য নিরাপত্তা কিংবা জীবিকার সন্ধান।
তবে এখন অনেককে স্বেচ্ছায় নয়, পাচার করে এসব নৌকায় তোলা হচ্ছে। অধিকারকর্মী ও শরণার্থী পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নৌকায় নির্যাতন, শোষণ ও রোগব্যাধি ব্যাপক।
রোহিঙ্গা অধিকার সংগঠন আরাকান প্রজেক্টের পরিচালক ক্রিস লেওয়া বলেন, কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ‘অপহরণের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি’ ঘটেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মানুষ অপহরণ করে তাদের পরিবারের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করছে। সবাইকে নৌকায় তোলা না হলেও সমুদ্রপথে পাচারের ব্যবসা বাড়ায় আরো যাত্রী সংগ্রহের চাহিদা তৈরি হয়েছে।
নুর জানান, ছেলের সঙ্গে শেষ আলাপে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি ফোনটি নিয়ে বলেছিল, ‘আপনার ছেলেকে এখানে বিক্রি করা হয়েছে এবং তাকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে।’
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের গ্রাম থেকে পালিয়ে নুর ও তার পরিবার বাংলাদেশে আসে। রাতে গ্রাম ছেড়ে সাত দিন হেঁটে তারা বাংলাদেশে পৌঁছেছিলেন। এখন ৫৫ বছর বয়সী নুর ছেলের স্মৃতিতে ভেঙে পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আশ্রয়ের প্রতিটি কোণ আমাকে তার কথা মনে করিয়ে দেয়।’
একই শিবিরে আরেক পরিবারের ২০ বছর বয়সী শিক্ষক হামিদ উল্লাহকেও মে মাসের শুরুতে অপহরণ করা হয়। তার পরিবার প্রথমে ১ হাজার ২০০ ডলার মুক্তিপণ দিতে না পারলেও পরে পাচারকারীরা আরো ৩ হাজার ২০০ ডলার দাবি করে। শেষবার মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় হামিদ উল্লাহ জানিয়েছিলেন, তাকে মালয়েশিয়াগামী একটি নৌকায় তোলা হচ্ছে। এর পর থেকে তার কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
জুলাইয়ে নিখোঁজ হওয়া দুটি নৌকা জুনের শেষ দিকে মিয়ানমার থেকে রওনা হয়েছিল। জাতিসংঘের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নৌকায় প্রায় ২৫০ জন এবং অন্যটিতে প্রায় ২৮০ জন ছিলেন। প্রথম নৌকাটি যাত্রার কিছুক্ষণের মধ্যেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দ্বিতীয়টি প্রায় এক সপ্তাহ পর মিয়ানমারের মধ্য উপকূলের কাছে ডুবে যায় বলে ধারণা করা হয়।
সাধারণত নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে এসব যাত্রা হলেও নৌকা দুটি বর্ষা মৌসুমে রওনা হয়েছিল। এসময় সমুদ্রে অনিয়মিত ঝড় ও উঁচু ঢেউয়ের ঝুঁকি থাকে। লেওয়ার মতে, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে যাত্রা কয়েক দফা পিছিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ২৯ জুন নৌকা দুটি ছাড়ে।
প্রথম নৌকাটি সকালে যাত্রা করে এবং মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যে ডুবে যায় বলে লেওয়া জানান। উত্তর রাখাইনের উপকূলে ওই নৌকার যাত্রী বলে ধারণা করা প্রায় ১০ রোহিঙ্গার মরদেহ পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পুলিশও জুলাইয়ের প্রথম দুই সপ্তাহে দক্ষিণ উপকূল থেকে পাঁচটি মরদেহ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে, যেগুলো অভিবাসীবাহী নৌকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
দ্বিতীয় নৌকাটি সন্ধ্যায় যাত্রা করে প্রায় নয় দিন চলার পর ৮ জুলাই আন্দামান সাগরে আয়াওয়াদ্দি উপকূলের কাছে ডুবে যায়। লেওয়া জানান, আয়াওয়াদ্দি ও আরো দক্ষিণে মোন রাজ্যের উপকূলে জেলেরা সমুদ্রে বেশ কয়েকটি মরদেহ পাওয়ার খবর দিয়েছেন।
এপ্রিলের মাঝামাঝি বাংলাদেশ থেকে ছেড়ে যাওয়া আরেকটি অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে ২৫০ জন নিখোঁজ হওয়ার পর সর্বশেষ এই দুই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটল। ওই ঘটনায় মাত্র নয়জনকে সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। এক উদ্ধার পাওয়া ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন, মাছ ও জাল রাখার জন্য তৈরি স্টোরেজ কক্ষে যাত্রীদের গাদাগাদি করে রাখা হয়েছিল। এতে নৌকা ডোবার আগেই অন্তত ৩০ জন শ্বাসরোধে মারা যান।
কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে অপরাধ, সহিংসতা, সীমিত সম্পদ ও কাজের সুযোগের অভাবও মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় ঠেলে দিচ্ছে। আরাকান প্রজেক্টের লেওয়া বলেন, ‘তারা তাদের ভবিষ্যতের জন্য কোনো সমাধান দেখতে পায় না। তাই তারা ঝুঁকি নেয়।’
কক্সবাজারের শিবিরগুলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির, যেখানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করেন। শরণার্থীদের শিবিরের বাইরে কাজ বা পড়াশোনা করার ওপর আইনগত বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে খাদ্যের মতো মৌলিক প্রয়োজনেও তারা আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। গত বছর ইউএসএআইডির সহায়তা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পর পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়েছে।
ছবি: রয়টার্স
জুনে জাতিসংঘ ও বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৭১ কোটি ৫ লাখ ডলার সহায়তার আবেদন জানায়। শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ‘সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন’ মেটাতে এই অর্থ চাওয়া হয়।
কক্সবাজারের পাহাড়ি ও ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরগুলোয় প্রায়ই ভারি বৃষ্টি ও ভূমিধস হয়। এতে মানুষ নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয় এবং বছরের কয়েক মাস রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে থাকে। শিবিরের ভেতরে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রায় প্রতিদিনই মানুষ অপহরণ করে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের নির্বাহী পরিচালক শাহরিয়ার সাদাত বলেন, ‘ভবিষ্যতের চিত্র বেশ হতাশাজনক।’ তার মতে, অতিরিক্ত জনসংখ্যা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় শিবিরগুলোয় অপরাধ বেড়েছে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক সেবা কমেছে।
সাদাত বলেন, অনেক সময় শরণার্থীদের জাহাজে ওঠানো হয় গন্তব্যে আর্থিক স্থিতিশীলতার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে।
মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছানোর পরও রোহিঙ্গারা ক্রমবর্ধমান বৈরিতার মুখে পড়ছেন এবং সেখানে তাদের কাজ করার সুযোগও সীমিত। কোনো দেশই জাতিসংঘের শরণার্থী কনভেনশনের স্বাক্ষরকারী নয়। গত মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, তার সরকার মিয়ানমারের সঙ্গে মালয়েশিয়ায় থাকা প্রায় ৫ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীকে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি করেছে।
শাব মিয়া মালয়েশিয়ায় গিয়ে ছয় মাস বয়সী মেয়ের জন্য ভালো জীবন নিশ্চিত করতে পারার আশায় নৌকায় উঠেছিলেন। কক্সবাজারে তার কাজ ছিল দোকানিদের মালপত্র বহন এবং অন্য শরণার্থীদের ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেয়া। স্ত্রী রুবিনা আক্তারের ভাষ্য অনুযায়ী, ভালো দিনে তিনি ১ থেকে দেড় ডলারের মতো আয় করতেন; অনেক দিন কোনো আয়ই হতো না।
গত জুনে শাব মিয়া আবার রাখাইন রাজ্যে ফিরে যান। নৌকাগুলো ছাড়ার কয়েক দিন আগে ২৩ জুন তিনি স্ত্রীকে ফোন করে মেয়ের ভালোভাবে যত্ন নিতে বলেন। এরপর থেকে তার আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
রুবিনা বলেন, ‘প্রতিদিন রাতে আমার মেয়ে তার বাবাকে পাশে না পেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। সে এত ছোট যে কেন তার বাবা আর ফিরে আসেনি, তা বুঝতে পারে না। কিন্তু একদিন সে আমাকে জিজ্ঞেস করবে, তার বাবা কোথায়। আমি কীভাবে উত্তর দেব, জানি না। কারণ আমি নিজেই এখনো তার অপেক্ষায় আছি। সত্যটা না জানা পর্যন্ত আমি আশা ছাড়তে পারি না, কান্নাও থামাতে পারি না।’
সিএনএনের প্রতিবেদন থেকে সংক্ষেপিত