নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃতের সংখ্যা ৭৫০ ছুঁল, নিখোঁজ তিন হাজার ছাড়িয়েছে

দুর্যোগ আঘাত হানার পঞ্চম দিনে এসে মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজনরা হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে ছবিগুলোর সঙ্গে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের চেহারা মেলানোর চেষ্টা করছেন। অনেকেই নিশ্চিত হতে পারছেন না। একদিকে উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও নদীর স্রোত থেকে নতুন নতুন মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে।

নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় দুদেশ মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালে অন্তত ৭৩৪ জনের এবং চীনের তিব্বত অঞ্চলে ১৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুদেশ মিলিয়ে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তিন হাজারেরও বেশি মানুষ। খবর দ্য গার্ডিয়ান, কাঠমান্ডু পোস্ট।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আজ রোববার সকাল ৯টায় প্রকাশিত অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্যে জানিয়েছে, দেশটির বন্যাকবলিত বেশ কয়েকটি জেলা থেকে মোট ৭৩৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে চিতওয়ানে সবচেয়ে বেশি ২৫৯ জনের, পূর্ব নবলপরাসীতে ১৮৪ জনের এবং পশ্চিম নবলপরাসীতে ৮২ জনের মরদেহ পাওয়া গেছে। এছাড়া গোরখায় ৫৮ জনের, নুওয়াকোটে ৫২ জনের, ধাদিংয়ে ৫০ জনের, তনহুঁতে ৩৬ জনের এবং রসউয়ায় ১৩ জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়ার পর অনেক মরদেহ শত শত কিলোমিটার দূর নদীর ভাটি অঞ্চল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

দেশটিতে এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৪৯৮ জনের নিখোঁজের তথ্য দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রসউয়ায় সবচেয়ে বেশি ৫৬২ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে। এছাড়া নুওয়াকোটে ১১৫ জন এবং মকওয়ানপুরে ৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজের তালিকায় একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ৯৩৩ জন, ৫৮৯ জন বিদেশী নাগরিক এবং তাদের সঙ্গে থাকা ১২৭ জন নেপালী নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া ৪৫ জন নেপালী সেনাবাহিনী, ২৭ জন নেপাল পুলিশ এবং ১৩ জন সশস্ত্র পুলিশ বলের সদস্যসহ মোট ৮৫ জন নিরাপত্তাকর্মী নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু এবং ২৬১ বিদেশী নাগরিকসহ ৫৪৬ জন নিখোঁজের কথা জানিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালে ধ্বংসস্তূপ ও পানির নিচে থাকা মরদেহ উদ্ধারে হিমশিম খাচ্ছে উদ্ধারকারী দল। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের নুয়াকোট জেলায় হেলিকপ্টারে করে ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে। কাপড়, চাল, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও শুকনো খাবার নিয়ে হেলিকপ্টারগুলো দুর্গত এলাকায় যাচ্ছে। ফেরার পথে নিয়ে আসছে বেঁচে যাওয়া মানুষকে। অনেকেই শুধু পরনের কাপড় নিয়ে উদ্ধার কেন্দ্রে পৌঁছেছে। তবে দুর্গত ত্রিশূলী থেকে মানুষ সরে গেলেও কেউ কেউ ফিরছে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া বাড়ি থেকে কিছু উদ্ধার করা যায় কিনা দেখতে।

দুর্যোগ আঘাত হানার পঞ্চম দিনে এসে মরদেহ শনাক্ত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজনরা হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে ছবিগুলোর সঙ্গে নিখোঁজ পরিবারের সদস্যদের চেহারা মেলানোর চেষ্টা করছেন। অনেকেই নিশ্চিত হতে পারছেন না। একদিকে উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও নদীর স্রোত থেকে নতুন নতুন মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে হতাহতের সংখ্যাও বাড়ছে।

দুর্গত জেলাগুলোয় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং অনুসন্ধান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে ১৯ হাজার ৮৯৫ জন নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নেপালী সেনাবাহিনীর ৮ হাজার ৩৯৯ জন, পুলিশের ৭ হাজার ২১৩ জন এবং সশস্ত্র পুলিশের ৪ হাজার ২০৩ জন সদস্য রয়েছেন।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী এ পর্যন্ত ৮,১৮৬ জনকে উদ্ধার করেছে। এই অভিযানে হেলিকপ্টার প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। এর মাধ্যমে গত দুই দিনে একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলের ভেতর আটকে থাকা ২৭৯ জনকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। হেলিকপ্টারে আরো ২২৭ জন বিদেশী নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোয় এরই মধ্যে ত্রাণ তহবিল ও সামগ্রী বিতরণ শুরু করেছে নেপাল সরকাল। নগদ সহায়তা হিসেবে রসউয়া এবং নুওয়াকোট প্রতিটি জেলাকে ১০ কোটি রুপি এবং ধাদিংকে ৫ কোটি রুপি দেয়া হয়েছে। এছাড়া ১৫টি স্থানীয় ইউনিটের মধ্যে আরো ৬৭ কোটি ৫০ লাখ রুপি বিতরণ করা হয়েছে।

এদিকে গত বুধবারের এ দুর্যোগের পর নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী এলাকার বাসিন্দা এবং উদ্ধারকর্মীদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পরিস্থিতি অবনতি হলে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার জন্যও প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

আরও