শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের মনোনয়ন নিয়ে প্রতি বছরই আলোচনা-সমালোচনা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনয়ন নিয়েও কম হাস্যরস হয়নি। তবে নোবেলের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, এটি নোবেলের ইতিহাসের সবচেয়ে স্ক্যান্ডালাস বা বিতর্কিত মনোনয়ন নয়। ইতিহাসের পাতায় এমন ৩ জন একচ্ছত্র একনায়ক ও শাসকের নাম রয়েছে, যাদের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হওয়াটা ছিল সবচেয়ে অবিশ্বাস্য ও বিতর্কিত।
বেনিতো মুসোলিনি, ১৯৩৫
ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনি ১৯২২ সাল থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত, প্রায় ২১ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তার শাসনামলে রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চলেছে। এর মধ্যেই ১৯৩৫ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। তখন তিনি আফ্রিকার দেশ আবিসিনিয়া, বর্তমান ইথিওপিয়া দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
নোবেল আর্কাইভে মুসোলিনির নামে দুটি মনোনয়নের তথ্য রয়েছে। এর একটি এসেছিল জার্মানির আইন অধ্যাপকদের কাছ থেকে। অন্যটি করেছিলেন ফরাসি আইন অধ্যাপক গিলবার্ট গিদেল। মুসোলিনির মনোনয়নের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ১৯২৯ সালের ল্যাটেরান চুক্তির মাধ্যমে ইতালি ও ভ্যাটিকানের দীর্ঘদিনের বিরোধের অবসানের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
তবে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি তাকে পুরস্কারের জন্য বাছাই করেনি। শেষ পর্যন্ত সে বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারও দেয়া হয়নি। পরে স্থগিত রাখা সেই পুরস্কার দেয়া হয় জার্মান সাংবাদিক ও শান্তিকর্মী কার্ল ফন অসিয়েটস্কিকে। ১৯৩৬ সালে তাকে ১৯৩৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়।
জোসেফ স্ট্যালিন, ১৯৪৫ ও ১৯৪৮
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট শাসক জোসেফ স্ট্যালিন একবার নয়, দুবার নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন—১৯৪৫ ও ১৯৪৮ সালে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায় এবং অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বিজয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। সেই প্রেক্ষাপটেই স্ট্যালিনের নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নে আসে। বিশেষ করে যুদ্ধ শেষ করার প্রচেষ্টার সঙ্গে তার ভূমিকার বিষয়টি মনোনয়নের কারণ হিসেবে সামনে এসেছিল।
তবে স্ট্যালিনের শাসনের আরেকটি দিক ছিল ব্যাপক দমন-পীড়ন। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, নির্বাসন, গুল্যাগ শ্রমশিবিরে বন্দিত্ব এবং ব্যাপক প্রাণহানির ইতিহাস তার শাসনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। তাই আজকের দৃষ্টিতে তার নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময়ের জন্ম দেয়। তিনি অবশ্য কখনো নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি।
অ্যাডলফ হিটলার, ১৯৩৯
ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি বিস্ময়কর, বিতর্কিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত মনোনয়ন এটি। মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর স্বৈরাচারী অ্যাডলফ হিটলারকে ১৯৩৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়!
তবে এ মনোনয়নের গল্পটি বেশ বিদ্রুপাত্মক। এটি কোনো সিরিয়াস সুপারিশ ছিল না; সুইডিশ পার্লামেন্টের সদস্য এরিক ব্র্যান্ড মূলত ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তৎকালীন ‘তুষ্টকরণ নীতি’র বিরুদ্ধে এক প্রচ্ছন্ন প্রতিবাদ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেন।
তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন ফ্যাসিবাদের সামনে কিছুটা নতি স্বীকার করে হিটলারের সঙ্গে চুক্তি সই করেছিলেন। সুইডিশ পার্লামেন্টের অনেকেই তখন চেম্বারলেইনকে নোবেলের জন্য মনোনীত করার কথা ভাবছিলেন। তাদের সে সিদ্ধান্তকে বিদ্রূপ করে এরিক ব্র্যান্ড ব্যঙ্গাত্মকভাবে হিটলারকে ‘বিশ্বশান্তির আশার আলো’ আখ্যা দিয়ে নোবেলের জন্য মনোনীত করেন।
কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে থমথমে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্রুপটি ভালোভাবে জনসাধারণ ও সংবাদমাধ্যম। তীব্র গণঅসন্তোষের মুখে দ্রুত মনোনয়নটি প্রত্যাহার করে নেন ব্র্যান্ড। অর্থাৎ হিটলারের নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন তালিকায় থাকলেও সেটি ছিল মূলত একটি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, বাস্তব পুরস্কারের সুপারিশ নয়।
মনোনয়ন মানেই সমর্থন নয়
এ বিতর্কিত ঘটনাগুলো নোবেল পুরস্কারের মহিমাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারেনি। হিটলার, মুসোলিনি ও স্ট্যালিনের ঘটনা নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও সামনে আনে—কোনো ব্যক্তির নাম মনোনীত হওয়া মানেই নোবেল কমিটি তাকে সমর্থন করেছে, এমন নয়।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য বিভিন্ন যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়ন দেয়ার সুযোগ রয়েছে। মনোনয়ন পাওয়া ব্যক্তিদের নিয়ে পরবর্তী সময়ে যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়া চলে। নোবেল কমিটি শেষ পর্যন্ত যোগ্য প্রার্থী বাছাই করে পুরস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়।