নির্বাচনে হেরে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়েছেন ফ্লাভিও বলসোনারো?

২০২৩ সাল থেকে ইতালির নাগরিকত্ব রয়েছে ফ্লাভিওর। দেশটির পাসপোর্টও তার কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ইনফোবায়ে জানিয়েছে, সোমবার রাতে তিনি আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী একটি প্রাইভেট জেটে ওঠার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে উড়োজাহাজটি যাত্রা করেনি

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হারের পর যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়েছেন কট্টর ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। গতকাল প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। তবে তিনি ঠিক কোথা থেকে যাত্রা করেছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

চলতি সপ্তাহে বামপন্থী বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে নির্বাচনে হারেন ফ্লাভিও। তিনি কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম মেট্রোপোলেস ফ্লাভিওর পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের বরাতে জানিয়েছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পথে রয়েছেন। গতকাল বিকালে তার ফ্লোরিডায় পৌঁছানোর কথা ছিল। ট্রাম্পের প্রশাসনকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

ফ্লাভিওর দেশত্যাগের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন লুলা দা সিলভা। ব্রাসিলিয়ায় নিজের ৮১তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘বলসোনারো পরিবারের সদস্যরা এমনই। ব্রাজিল তাদের দ্বিতীয় মাতৃভূমি। প্রথম মাতৃভূমি হলো যুক্তরাষ্ট্র, দেশটির বুট চাটা তাদের কাজ।’

লুলা আরো বলেন, ‘যে ব্যক্তি নির্বাচনে হেরে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, তার বিবেক কী বলছে, তা আমি ভাবি। যার কিছু লুকানোর নেই, তার ভয়ও নেই। যে নাগরিক গোপনে দেশ ছেড়ে চলে যায়, তার কিছু না কিছু দায় রয়েছে। ব্রাজিল ছেড়ে যাওয়ার এই কাজ লজ্জাজনক।’

বলসোনারোর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বরাতে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বলসোনারো পরিবারের ঘনিষ্ঠ এক আইনজীবী দেশত্যাগের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়তা করেছেন। অন্যদিকে সিএনএন ব্রাজিল জানিয়েছে, মঙ্গলবার ভোরে স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে দেশ ছেড়েছেন ফ্লাভিও।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ফ্লাভিও ও তার পরিবারের সদস্যদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ দিতে ভিসা দেয়া হবে।

এদিকে লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির আইনপ্রণেতারা বলসোনারোকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিতে সুপ্রিম কোর্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তার নাম ইন্টারপোলের রেড নোটিশ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করেছেন।

গত সোমবার থেকে ফ্লাভিওকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। গতকাল সকাল ১১টার মধ্যে ফেডারেল পুলিশের কাছে পাসপোর্ট জমা দেয়ার নির্দেশ থাকলেও তিনি হাজির হননি। এতে তার দেশত্যাগের গুঞ্জন আরও জোরালো হয়। অর্থ পাচারের অভিযোগে চলমান একটি মামলার অংশ হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের এক বিচারপতি নির্বাচনের ফল ঘোষণার কয়েক মিনিটের মধ্যে তার পাসপোর্ট বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই মামলায় বেটিং কোম্পানিগুলোকে ঘিরে প্রায় ৯০৫ কোটি ডলারের অর্থ পাচারের পরিকল্পনায় ফ্লাভিওর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা তদন্ত করছে ফেডারেল পুলিশ।

ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ও গ্লোবো জানিয়েছে, সোমবার বন্ধু ও আইনজীবীদের সঙ্গে বৈঠকের সময় পরাজিত প্রার্থীকে অস্থির দেখাচ্ছিল। তিনি গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

২০২৩ সাল থেকে ইতালির নাগরিকত্ব রয়েছে ফ্লাভিওর। দেশটির পাসপোর্টও তার কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ইনফোবায়ে জানিয়েছে, সোমবার রাতে তিনি আর্জেন্টিনায় পালিয়ে যাওয়ার পর সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী একটি প্রাইভেট জেটে ওঠার পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে উড়োজাহাজটি যাত্রা করেনি। আর্জেন্টিনার টেলিভিশন চ্যানেল তোদো নোতিসিয়াসের দাবি, ফ্লাভিও পায়ে হেঁটে সীমান্ত অতিক্রম করে দেশটিতে প্রবেশ করেন। তার চলাচলের খবর প্রকাশ হয়ে পড়ার পর উড়োজাহাজে ওঠার পরিকল্পনা বাতিল করা হয়।

তবে আর্জেন্টিনায় প্রবেশের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি পাওয়া যায়নি। এ কারণে ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ আর্জেন্টিনার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রবেশের কোনো রেকর্ড রয়েছে কিনা, তা যাচাই করছে।

ফ্লাভিও অবশ্য এখনো নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেননি। তার ভাই ও সাবেক কংগ্রেস সদস্য এদুয়ার্দো বলসোনারো বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন। গত শুক্রবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনে হেরে গেলে তাঁর ভাইয়ের ব্রাজিল ছেড়ে যাওয়া উচিত।

ফ্লাভিওর সম্ভাব্য দেশত্যাগ ব্রাজিলের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। তার বাবা জাইর বলসোনারো অভ্যুত্থানের চেষ্টা করার অভিযোগে গৃহবন্দি রয়েছেন। ভাই এদুয়ার্দো যুক্তরাষ্ট্রে এবং আরেক ভাইয়ের অবস্থান নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এদুয়ার্দোর বিরুদ্ধে ব্রাজিলে গ্রেফতারি পরোয়ানা রয়েছে। বাবার বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিচারকদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধ জানানোর ঘটনায় তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

মিনাস জেরাইসের ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাগনা ইনাসিও মনে করেন, বলসোনারো পরিবারের নেতৃত্বের অবস্থান দুর্বল হলে ব্রাজিলের ডানপন্থী রাজনীতিতে শূন্যতা তৈরি হতে পারে। তার ভাষায়, কট্টরপন্থী শিবিরকে ক্ষমতায় বসাতে ভোটারদের অনীহা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ডানপন্থী রাজনীতির নেতৃত্ব এখন নতুন করে নির্ধারিত হতে পারে।

আরও