লাখো মানুষের অশ্রুসিক্ত ভালোবাসায় খামেনির জানাজা

পুরো তেহরান ঢেকে গিয়েছিল শোকের কালো রঙে। কালো পোশাকে লাখো মানুষের ঢল নেমেছিল ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রাঙ্গণে।

কারো হাতে ইরানের পতাকা, কারো হাতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতিকৃতি, আবার অনেকের চোখ ভেজা অশ্রুতে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দেশ পরিচালনা করা খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে রাজধানী তেহরান পরিণত হয় এক বিশাল শোকমঞ্চে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বর্ণনা অনুযায়ী, গতকালের এ জানাজা ছিল শনিবারের তুলনায় আরো অনেক বেশি জনসমাগমপূর্ণ। ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ তেহরানে জড়ো হতে শুরু করে। ইরানের মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত প্রায় ৭০ লাখ যাত্রা নিবন্ধিত হয়েছে।

জানাজায় ইমামতি করেন ৯৭ বছর বয়সী শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। তার পেছনে সারিবদ্ধভাবে রাখা ছিল আলি খামেনি ও তার পরিবারের আরো কয়েকজন সদস্যের কফিন। শোকাহত মানুষের কান্না আর সমবেত প্রার্থনার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় রাষ্ট্রীয় এ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।

সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে খামেনির তিন ছেলে—মাসউদ, মেইসাম ও মোস্তাফার উপস্থিতি। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম তাদের প্রকাশ্যে দেখা গেল। কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে মাসউদ খামেনিকে বারবার চোখের পানি মুছতে দেখা যায়। তবে উপস্থিত ছিলেন না নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। যুদ্ধের শুরুতে তার বাবার ওপর হওয়া বিমান হামলায় তিনিও আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণেই তিনি এখনো প্রকাশ্যে আসছেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানাজায় উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের প্রধান আহমদ বাহিদি, কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি, বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম হোসেইন মোহসেনি এজেইসহ সরকারের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা। কয়েক মাস আগেও তাদের একসঙ্গে প্রকাশ্যে দেখা প্রায় অকল্পনীয় ছিল। যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েল প্রকাশ্যে আসা অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।

আলি খামেনির শেষ বিদায়ের প্রার্থনায় ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা ছবি: রয়টার্স

তবে শোকের পাশাপাশি আয়োজনজুড়ে ছিল প্রতিশোধের আহ্বানও। মোসাল্লা প্রাঙ্গণের বিভিন্ন স্থানে টানানো ব্যানার ও দেয়াললিখনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে স্লোগান দেখা যায়। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ও কবি মোহাম্মদ রাসুলি তার বক্তব্যে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন তোলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষটি এখনো বেঁচে আছে কেন?’ তার এ বক্তব্যের পর উপস্থিত জনতা ‘আমেরিকার মৃত্যু’ ও ‘ইসরায়েলের মৃত্যু’ স্লোগানে প্রাঙ্গণ মুখর করে তোলে।

সাধারণ শোকাহত মানুষের অনেকেই প্রতিশোধের দাবি জানান। ২৯ বছর বয়সী মুদি দোকানকর্মী গোলামরেজা সাবুনি বলেন, ‘তারা আমাদের ইমামকে হত্যা করেছে। তাদের নেতাকেও হত্যা করা উচিত।’ অন্যদিকে অনেকেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির নির্দেশের অপেক্ষার কথা বলেছেন। ৪২ বছর বয়সী নার্স জিবা নাদেরি বলেন, ‘প্রতিশোধের আহ্বান শুনেছি, কিন্তু আমাদের নেতা যা বলবেন, সেটাই আমাদের অনুসরণ করা উচিত।’

শোকানুষ্ঠান ঘিরে তেহরানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বন্ধ রাখা হয়েছে, আকাশসীমায়ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। প্রচণ্ড গরমে মানুষের কষ্ট কমাতে স্বেচ্ছাসেবকেরা ভিড়ের মধ্যে পানি ছিটিয়ে দিচ্ছিলেন। চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতেও অতিরিক্ত প্রস্তুতি রাখা হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, কয়েক হাজার মানুষ চিকিৎসাসেবা নিলেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

আজ তেহরানের রাজপথে খামেনির কফিন নিয়ে বিশাল শোক মিছিল হবে। এরপর তা নেয়া হবে শিয়া ধর্মীয় শিক্ষা ও নেতৃত্বের কেন্দ্র কোমে। সেখান থেকে মরদেহ যাবে ইরাকের পবিত্র শহর নাজাফ ও কারবালায়। সবশেষে বৃহস্পতিবার তার জন্মস্থান মাশহাদে ইমাম রেজার মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হবে। সপ্তাহজুড়েই চলবে রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান।

আরও