ইরানে ১৭০ লক্ষ্যবস্তুতে মার্কিন হামলায় নিহত ১৪, উপসাগরজুড়ে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে তেহরান

কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির যে নাজুক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা আবারো ভেঙে পড়ার মুখে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলায় মধ্যপ্রাচ্য ফের বড় ধরনের সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত দুইদিনে তারা হরমুজ প্রণালির উপকূলসংলগ্ন ইরানের অন্তত ১৭০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুদাম, রেভল্যুশনারি গার্ডের নৌযান, লজিস্টিক অবকাঠামো ও উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটি ছিল। শুধু বৃহস্পতিবারই প্রায় ৯০টি স্থানে হামলা হয়েছে বলে দাবি করেছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানও কুয়েত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক আাকারে হামলা চালিয়েছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির ১৪ নাগরিক নিহত হয়েছে। আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পৃথক হামলায় তিন আইআরজিসি সদস্যও নিহত হয়েছেন।

ওয়াশিংটনের অভিযোগ, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান যুদ্ধবিরতির মৌলিক শর্ত ভঙ্গ করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো সম্মেলন শেষে বলেন, ‘জাহাজে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেই নতুন বিমান হামলা চালানো হয়েছে।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানে বিস্ফোরণের ভিডিও প্রকাশ করে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এ ধরনের হামলা আবার হলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হবে।’ একই সঙ্গে তিনি ইরানের বিদ্যুৎ ও লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামো এবং দেশটির প্রধান তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপেও হামলার হুমকি পুনর্ব্যক্ত করেন।

অন্যদিকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে গত মাসে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের সরাসরি লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে ফোনালাপে বলেন, ‘প্রয়োজন হলে ইরান আত্মরক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।’ পাকিস্তান সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অন্যতম মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান পাল্টা আঘাত হানে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানায়, জর্ডানের আজরাক সামরিক ঘাঁটিতে ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইরানের দাবি, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সেন্টার রয়েছে। তবে জর্ডান জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে এবং কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। যদিও ভূপাতিত ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ বিভিন্ন এলাকায় পড়ে। এর পাশাপাশি কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারের দিকেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১০টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। ধ্বংসাবশেষ পড়ে একজন আহত হয়েছেন। বাহরাইনও হামলা প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। কাতারে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া না গেলেও নাগরিকদের মোবাইল ফোনে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হয় এবং সামরিক সতর্কতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করা হয়।

ইরানের সেনাবাহিনী দাবি করেছে, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলা চালায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সব মার্কিন ঘাঁটি তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় থাকবে। একই সময় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, কেন্দ্রের মূল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, তবে পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিস্ফোরণ হয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে এ নিয়ে একাধিকবার বুশেহর এলাকায় হামলা হলেও এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্র অক্ষত রয়েছে।

এছাড়া উত্তরাঞ্চলের গোলেস্তান প্রদেশে আক তাকেহ খান রেলসেতুতেও হামলা হয়েছে। ফার্স নিউজ এজেন্সির দাবি, এ সেতুটি চীন, রাশিয়া, তুর্কমেনিস্তান ও কাজাখস্তানের সঙ্গে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থলবাণিজ্য করিডোরের অংশ। পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলোতে অবরোধের পর থেকে এ রুটের কৌশলগত গুরুত্ব অনেক বেড়েছে। ইরানের ভাষ্য, সেতুটি দ্রুত মেরামত করা হবে। স্যাটেলাইট চিত্রেও দক্ষিণ উপকূলের সারখুর তাহরুই বন্দরের একটি ভবনে ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ মিলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা, যাতে তারা আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে আর বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করেই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বে সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের সময় জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছিল এবং বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা লাগে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দৈনিক প্রায় ৪০টি জাহাজ চলাচল শুরু হলেও যুদ্ধের আগের দৈনিক ১২৫ থেকে ১৪০টি জাহাজের তুলনায় তা অনেক কম। বৃহস্পতিবার নতুন হামলার পর আবারো তেলবাহী জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে।

আইআরজিসির নৌবাহিনী দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলাই হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করছে। তাদের ভাষ্য, ইরানের নিয়ন্ত্রণে প্রণালির সক্ষমতা যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থার প্রায় অর্ধেকে ফিরেছিল এবং অনুমোদিত রুট ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর জন্য ধীরে ধীরে চলাচল বাড়ানো হচ্ছিল। ওমান ও তুরস্কের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগও জোরদার করেছে তেহরান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পৃথক টেলিফোন আলাপে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি এবং উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ইরানের অভ্যন্তরেও হামলার প্রভাব বাড়ছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনের মার্কিন বিমান হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৪৭ জন এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এছাড়া খুজেস্তান প্রদেশে পৃথক হামলায় আইআরজিসির তিন সদস্য নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।

সংঘাতের কারণে যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখতে আলোচনার যে প্রক্রিয়া চলছিল, তা কার্যত স্থবির হয়ে গেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির দাফন শেষ হওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। আলোচনার মূল বিষয় ছিল হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেয়া, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরি এবং ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘আমেরিকা এখনো শেখেনি যে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও শক্তি প্রদর্শনের মূল্য দিতে হয়। আপনারা আঘাত করলে পাল্টা আঘাত পাবেন।’

আরও