ওমানের একটি সংরক্ষিত প্রাকৃতিক এলাকার কাছে আটকে পড়া একটি ট্যাংকার থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ছড়িয়ে প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে তেলস্তর তৈরি হয়েছে বলে গতকাল জানিয়েছে দেশটির সরকার। খবর রয়টার্স।
ক্যারোলিন বেজেঙ্গি নামের ট্যাংকারটিতে এশিয়ার উদ্দেশে নেয়া প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল রুশ জ্বালানি তেল রয়েছে। গত ৮ জুন ইয়েমেনের কাছে জাহাজটি প্রথম সমস্যায় পড়ার কথা জানা যায়। সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র তখন জানিয়েছিল, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল জাহাজটিতে বিস্ফোরণ ঘটেছে। তবে এ হামলার দায় এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ স্বীকার করেনি।
পরিবেশের ওপর এই দুর্ঘটনার প্রভাব নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে তথ্য দিয়েছে ওমান। দেশটির সরকার জানিয়েছে, হলানিয়াত দ্বীপপুঞ্জের কাছে ছড়িয়ে পড়া জ্বালানি তেল নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করছে।
গত বছর ওমানের সুলতান হাইথাম বিন তারিক এক রাজকীয় আদেশে দ্বীপগুলোকে ঘিরে একটি প্রাকৃতিক সংরক্ষিত এলাকা প্রতিষ্ঠা করেন। এই এলাকায় আরব সাগরের হাম্পব্যাক তিমি ও সোকোত্রা করমোর্যান্টসহ বিভিন্ন প্রাণীর বসবাস রয়েছে।
ওমানের পরিবেশ কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়ার পরিমাণ প্রায় ৩৯০ বর্গকিলোমিটার (১৫০ বর্গমাইল)। তবে ওই এলাকার পানি পরিশোধনাগার ও পর্যটনকেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থাপনা নিয়ে এখনো কোনো উদ্বেগ নেই।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তেলের স্তরটি দ্বীপগুলোর উত্তর-পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়েছে এবং উপকূল থেকে আনুমানিক সাত কিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিনপিস গত সপ্তাহে স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছিল, তেলের স্তর প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে।
এডিনবরোর হেরিয়ট-ওয়াট বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশগত অণুজীববিজ্ঞান ও জৈবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক টনি গুতিয়েরেজ বলেন, এ ধরনের বড় মাত্রার ছড়িয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত এলাকায় উড়োজাহাজ থেকে জ্বালানি তেল ভাঙতে সহায়ক রাসায়নিক ছিটাতে হয়। পাশাপাশি তেল উপকূলে পৌঁছানোর বা সমুদ্রের তলদেশে ডুবে যাওয়ার আগেই তা সংগ্রহ করতে বুমসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়।
তিনি বলেন, জ্বালানি তেল যদি সমুদ্রের গভীর পানিতে আটকে রাখা যায়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হবে। কিন্তু যদি অগভীর পানিতে বা সরাসরি উপকূলে পৌঁছে যায়, তাহলে ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারে। এতে প্রবাল, পাখি ও মাছসহ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গুতিয়েরেজ বলেন, এ জ্বালানি তেলের কিছু অংশ বছরের পর বছর সমুদ্রে থেকে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ১৯৮৯ সালে আলাস্কায় ‘এক্সন ভ্যালডিজ’ ট্যাংকার দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। ওই দুর্ঘটনার এক দশক পরও সেখানে তেলের অবশিষ্টাংশ পাওয়া গিয়েছিল।
রয়টার্সের স্যাটেলাইট ছবি ও জাহাজ চলাচল বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ২৭৪ মিটার (৯০০ ফুট) দীর্ঘ ট্যাংকারটি আটকে পড়ার পর সৃষ্ট জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়া গত মাসের শেষ নাগাদও অব্যাহত ছিল। এতে সম্ভাব্য পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
জাহাজ চলাচলের তথ্যানুযায়ী, ক্যারোলিন বেজেঙ্গি গত এপ্রিলে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর নভোরোসিস্ক থেকে জ্বালানি তেল বোঝাই করে। মে মাসের শেষ দিকে এটি সুয়েজ খাল অতিক্রম করে।
২০০১ সালে নির্মিত ট্যাংকারটি রাশিয়ার ব্যবহৃত তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ। এসব পুরোনো তেলবাহী জাহাজের পশ্চিমা বিমা সুবিধা নেই এবং প্রকৃত মালিকানা আড়াল করতে বিভিন্ন দেশের পতাকা ব্যবহার করে চলাচল করে।
প্রকাশ্য জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত তথ্যভান্ডারে ক্যারোলিন বেজেঙ্গিকে ক্যামেরুনের পতাকাবাহী জাহাজ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তবে জুনে ক্যামেরুনে নিবন্ধন তালিকা থেকে বাদ দেয়া ৩৯টি জাহাজের মধ্যে এটিও ছিল।
জাহাজটির ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও সুইজারল্যান্ডের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এলএসইজি তথ্যানুযায়ী, জাহাজটির নিবন্ধিত মালিক রেন্টুর শিপম্যানেজমেন্ট লিমিটেড এবং ব্যবস্থাপক ভিলার শিপম্যানেজমেন্ট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করতে পারেনি রয়টার্স। প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যালয় চীনে বলে ধারণা করা হয়।