দুই দশকেরও বেশি সময় পর ইরাকে থাকা সর্বশেষ ঘাঁটিগুলো থেকে সেনা প্রত্যাহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামীকাল বুধবারের মধ্যে এ কার্যক্রম শেষ করার কথা রয়েছে। ইরাকের রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ইরানের গভীর প্রভাব থাকায় মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর দেশটিতে সে প্রভাব আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। খবর রয়টার্স।
২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন শুরুর পর দুই দশকের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর মধ্যেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে।
ইরাকের নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, এ অঞ্চল থেকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিদায়ে কৌশলগতভাবে লাভবান হবে ইরান। ইরানপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো এ প্রত্যাহারকে নিজেদের বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের প্রভাব আরো বাড়ানোর চেষ্টা করবে।
ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মুজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরাকের ইসলামপন্থী প্রতিরোধ গোষ্ঠী ও ইরাকিদের জন্য ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ এবং মার্কিন প্রকল্পের ‘চূর্ণ পরাজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি ‘কালো অধ্যায়ের’ সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। দিনটি উদযাপন করা হবে। বিদেশী সেনাদের মাধ্যমে নয়, বরং প্রতিরোধ ও জনগণের ইচ্ছার মাধ্যমে ইরাকের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব—এটি ইরাক প্রমাণ করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইরাক এখনো প্রস্তুত নয়
ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে সাধারণভাবে অনেকেই সমর্থন করলেও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর শক্তি নিয়ে উদ্বিগ্নরা মনে করছেন, এ প্রত্যাহার সময়ের আগেই হচ্ছে। এক সময় মার্কিনবিরোধী প্রতিরোধের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ফালুজ্জার সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জুবাই রয়টার্সকে বলেন, আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে ইরাক পুরোপুরি নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।
তিনি বলেন, সব ইরাকি পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায় এবং এ নিয়ে কোনো ইরাকির দ্বিমত থাকার কথা নয়। তবে এভাবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের চলে যাওয়া এবং একটি শূন্যতা তৈরি করাই ইরাকিদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।
২০০৩ সালে সুন্নি মুসলিম শাসক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরে দেশটি দখলে নিয়ে শিয়াপন্থী নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে এবং কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহ দমনে লড়াই চালায়। ২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন সেনারা ইরাক থেকে প্রত্যাহার করে।
এর প্রায় তিন বছর পর আবার ইরাকে ফিরে আসে মার্কিন সেনারা। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বড় ধরনের যুদ্ধে সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে পরাজিত করতে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করে তারা।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রাখা একমাত্র দেশ ছিল ইরাক। বিভিন্ন সময়ে ইরাকের ভূখণ্ড দুই দেশের প্রক্সি সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে।
২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরে এক হামলায় ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। এর পর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে বারবার হামলা চালায়। এসব হামলার জবাবও দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
চলতি বছরের ইরানবিরোধী যুদ্ধে নিহত ১৮ মার্কিন সেনার মধ্যে সাতজন ইরাকে নিহত হন। সর্বশেষ জুলাইয়ে এরবিলের কাছে একটি ঘাঁটিতে একটি ড্রোন নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় এক মার্কিন সেনা সার্জেন্ট নিহত হন।
এদিকে ইরান বলে আসছে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করানোই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে তেহরান তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর বিজয় হিসেবে দেখছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের উপপ্রধান আমির হায়াত মোঘাদ্দাম সোমবার বলেন, মার্কিন সেনারা ইরাক ও অঞ্চলটি ছেড়ে যাওয়ার পর ইরাকে দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি আরো বলেন, ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান স্বাগত জানায় এবং নিঃসন্দেহে এ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করবে। ইরান-সমর্থিত প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো বর্তমানে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে এবং কখনো কখনো মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো তেহরানের নির্দেশে প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাতে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ করেছে ওয়াশিংটন। চলতি মাসে সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইনে হামলার ঘটনাও এর মধ্যে রয়েছে। তবে বাগদাদ সরকার বলছে, এসব গোষ্ঠীর প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে তারা।
ইসলামিক স্টেট কি আবার সক্রিয় হবে?
ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকার এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের কয়েকজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইসলামিক স্টেট আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। প্রায় এক দশক আগে নিজেদের ঘোষিত খেলাফতের পতন হলেও গোষ্ঠীটির ‘স্লিপার সেল’ বা গোপন সক্রিয় নেটওয়ার্ক এখনো রয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
এক সময় ইসলামিক স্টেটের যোদ্ধারা ইরাকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা দখল করেছিল। তাদের হাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়। নিহতদের মধ্যে শতাধিক ব্যক্তিকে সাবেক একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ভেতরে গুলি করে হত্যার দৃশ্য ভিডিও করে প্রকাশ করেছিল গোষ্ঠীটি।
কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য, লজিস্টিক সহায়তা ও ড্রোনের অভাবে ইসলামিক স্টেট পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে। তিনি আরো বলেন, ইরাক থেকে সেপ্টেম্বরের শেষে আন্তর্জাতিক জোট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করবে—এমন খবর গণমাধ্যমে প্রকাশের পর গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইসলামিক স্টেটের স্লিপার সেলগুলোর তৎপরতা তারা লক্ষ্য করছেন। তার মতে, এতে জঙ্গিদের মনোবল বেড়েছে।
ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনী জানিয়েছে, ইসলামিক স্টেটের সন্দেহভাজন একটি সেল মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইরাকের চারজন নিরাপত্তা ও সেনা কর্মকর্তা বলেন, এ পরিকল্পনা দেখিয়েছে যে বছরের পর বছর সামরিক বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও নিরাপত্তার শূন্যতা কাজে লাগানোর সক্ষমতা এখনো গোষ্ঠীটির রয়েছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তেলনগরী কিরকুকে দায়িত্ব পালনকারী জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা কর্নেল খালিদ আল-বায়াতি বলেন, ইসলামিক স্টেট এমন একটি বার্তা দিতে চাইছে যে গোষ্ঠীটি এখনো শক্তিশালী এবং প্রাণঘাতী হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে।