একসময় বিশ্বের সবচেয়ে বিরল পাখি হিসেবে পরিচিত ছিল ব্ল্যাক রবিন। অসাধারণ এক সংরক্ষণ প্রকল্পের মাধ্যমে বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে আসা পাখিটি এবার রেকর্ডসংখ্যক ভোট পেয়ে নিউজিল্যান্ডের ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার’ নির্বাচিত হয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
ছোট আকারের পাখিটি নিউজিল্যান্ডের মূল ভূখণ্ড থেকে ৮০০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জেই পাওয়া যায়। মাওরি ভাষায় পাখিটির নাম ‘কাকারুইয়া’ এবং চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জের আদিবাসী মোরিওরি ভাষায় ‘কারুরে’। গাঢ় কালো পালক, কালো চোখ এবং সামান্য সূচালো কালো ঠোঁটের কারণে নিউজিল্যান্ডের পাখিজগতে আদর করে এদের ‘গথ’ বলেও ডাকা হয়।
আবাসস্থল ধ্বংস এবং বাইরে থেকে আসা ক্ষতিকর প্রাণীর কারণে ব্ল্যাক রবিনের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যায়। ১৯৭০-এর দশকে এই পাখির সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র পাঁচটিতে। তখন প্রজননক্ষম একটি জোড়াই অবশিষ্ট ছিল।
এরপর শুরু হয় প্রজনন কর্মসূচি। এ কর্মসূচিতে ব্ল্যাক রবিনের ডিম ফোটাতে অন্য প্রজাতির পাখিকে পালক মা হিসেবে ব্যবহারের নতুন পদ্ধতি নেয়া হয়। উদ্যোগটি সফল হয় এবং ধীরে ধীরে ব্ল্যাক রবিনের সংখ্যা বেড়ে এখন প্রাপ্তবয়স্ক পাখির সংখ্যা প্রায় ৩৫০-এ দাঁড়িয়েছে। তবে পাখিটি এখনো ‘হুমকির মুখে’ থাকা প্রজাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ।
চ্যাথাম আইল্যান্ডস ল্যান্ডস্কেপ রেস্টোরেশন ট্রাস্টের মুখপাত্র জেস ম্যাকেঞ্জি জানান, গত কয়েক বছর ধরে ব্ল্যাক রবিন ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতার শীর্ষ পাঁচে থাকলেও কখনো জয় পায়নি।
তিনি বলেন, ‘এটি এমন একটি পাখি, যেটিকে নিউজিল্যান্ডের মানুষ নিশ্চিতভাবেই ভালোবাসে এবং চেনে।’
নাম ব্ল্যাক রবিন হলেও এই পাখি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের রবিন পাখির একই পরিবারের সদস্য নয়। এটি সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রজাতি। চ্যাথাম দ্বীপপুঞ্জে তারা নিচু ভূমির উপকূলীয় বনাঞ্চলে বসবাস করে। বর্তমানে দুটি সীমিত আকারের, কীটপতঙ্গমুক্ত প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকায় তাদের দেখা যায়।
তবে সংরক্ষণে সাফল্য এলেও ব্ল্যাক রবিন এখনো পুরোপুরি ‘রক্ষা পেয়েছে’ বলা যায় না। ম্যাকেঞ্জি বলেন, দ্বীপগুলোয় তাদের আবাসস্থল প্রায় পূর্ণ হয়ে গেছে। তাদের জন্য আরো একটি কীটপতঙ্গমুক্ত দ্বীপ প্রয়োজন।
সংরক্ষণ সংগঠন ফরেস্ট অ্যান্ড বার্ড আয়োজিত ‘বার্ড অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতাটি ২০ বছর আগে শুরু হয়। নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় পাখিদের দুরবস্থা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই এ প্রতিযোগিতার লক্ষ্য। কীটপতঙ্গের আগ্রাসন, মানুষের কর্মকাণ্ড এবং আবাসস্থল কমে যাওয়ার কারণে দেশটির অনেক স্থানীয় পাখি হুমকির মুখে রয়েছে, বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে কিংবা এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে।
এবারের প্রতিযোগিতায় রেকর্ড ১ লাখ ৫ হাজার ভোট পড়েছে। এর মধ্যে নিউজিল্যান্ড থেকে প্রায় ৮৮ শতাংশ ভোট এসেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ভারী টিয়া পাখি কাকাপো দ্বিতীয় হয়েছে। আর ২০২৫ সালের বিজয়ী ও নিউজিল্যান্ডের একমাত্র বাজপাখি প্রজাতি কারেয়ারা তৃতীয় হয়েছে।
এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক ও কেলেঙ্কারিও হয়েছে। ২০২১ সালে একটি বাদুড়কে বিজয়ী করা থেকে শুরু করে ২০১৯ সালে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ এবং ২০১৮ সালে অস্ট্রেলীয়রা ‘শ্যাগ’ পাখিকে জেতাতে প্রতিযোগিতায় কারচুপির চেষ্টা করেছিল—এমন অভিযোগও উঠেছিল।
২০২৩ সালে ব্রিটিশ-আমেরিকান কৌতুক অভিনেতা ও টক শো উপস্থাপক জন অলিভার হুমকির মুখে থাকা পাখি পুতেকেতেকের পক্ষে বিশ্বব্যাপী প্রচার চালান। ওই বছর পুতেকেতেকে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়।