আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

হরমুজে আসলে কার দাপট বেশি? জাহাজের গতিপথে মিলছে ইরানের উত্তর

যুদ্ধের আগে হরমুজে মূলত একটি কেন্দ্রীয় নৌপথই ব্যবহৃত হতো। এখন সেটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। ইরান চাইছে উত্তর দিকের, দেশটির উপকূলঘেঁষা পথটি ব্যবহার করা হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ দক্ষিণের ওমান-ঘেঁষা পথটি, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর সুরক্ষা রয়েছে।

হরমুজ প্রণালি এখন শুধু জাহাজ চলাচলের পথ নয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনেরও মঞ্চ। ওয়াশিংটন বলছে, তারা প্রণালির জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। তেহরানও নিজেদের নির্ধারিত পথ ছাড়া জাহাজ চলাচল ঠেকাতে চাইছে। কিন্তু আগস্টের প্রথম ১৯ দিনের জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, এর বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন।

জাহাজ কোন পথে যাচ্ছে?

যুদ্ধের আগে হরমুজে মূলত একটি কেন্দ্রীয় নৌপথই ব্যবহৃত হতো। এখন সেটি কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত। ইরান চাইছে উত্তর দিকের, দেশটির উপকূলঘেঁষা পথটি ব্যবহার করা হোক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ দক্ষিণের ওমান-ঘেঁষা পথটি, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর সুরক্ষা রয়েছে।

গত ১ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত তেল, এলপিজি ও এলএনজি বহনকারী ১১২টি জাহাজ হরমুজ পার হয়েছে। এর মধ্যে ২১টি প্রকাশ্যে ইরানের পথ এবং মাত্র দুটি ওমানের পথ ব্যবহার করেছে। বাকি ৮৯টি জাহাজ পরিচয় বা গতিপথ গোপন রেখেছে।

সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ ধরলে একই সময়ে মোট ২৩৬টি জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ৮৩টি ইরানের পথ, ৩টি ওমানের পথ এবং ২টি যুদ্ধের আগের কেন্দ্রীয় পথ ব্যবহার করেছে। ১৪৮টি জাহাজের পথ ছিল অজ্ঞাত বা গোপন।

জাহাজগুলো কেন তাদের পরিচয় লুকাচ্ছে?

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দুই পক্ষই যুদ্ধের পর নিজেদের নির্দেশনা অমান্য করা জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তাই অনেক জাহাজ স্বয়ংক্রিয় পরিচয় শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ করে দিচ্ছে, যাতে তাদের অবস্থান সহজে শনাক্ত করা না যায়। কেউ কেউ আবার মাঝসমুদ্রে অন্য জাহাজে পণ্য তুলে দিচ্ছে।

গত ৮ আগস্ট সংযুক্ত আরব আমিরাত একটি তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার অভিযোগ আনে ইরানের দিকে। ওই জাহাজের মালিক প্রতিষ্ঠান জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর তাদের ১৫টি জাহাজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। এতে একজন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন।

তাহলে ভয় কার বেশি?

এদিকে পরিসংখ্যান বলছে, মার্কিন অবরোধ সত্ত্বেও এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানিবাহী জাহাজ প্রকাশ্যে ইরানের পথ নিয়েছে। সব পণ্যবাহী জাহাজ ধরলে এ হার মোট ৩৫ শতাংশ। বিপরীতে ইরানের নির্ধারিত পথ এড়িয়ে প্রকাশ্যে চলেছে মাত্র চারটি জাহাজ। অর্থাৎ জাহাজ পরিচালনাকারীদের কাছে ওয়াশিংটনের চেয়ে তেহরানকে অসন্তুষ্ট করার ভয়ই বেশি বলে মনে হচ্ছে।

তবে এর অর্থ ইরান নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এমন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা এখনো তেহরানের যথেষ্ট রয়েছে। তবে বিকল্প সরবরাহপথ, জাহাজ বদল করে পণ্য পরিবহন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা সেই নিয়ন্ত্রণকে সীমিত করছে।

বিশ্ববাজারে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি হরমুজ দিয়ে যেত। প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ চলাচল করত। মার্চে ইরান প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম লাফিয়ে বেড়েছে। যুদ্ধের শুরুতে অপরিশোধিত ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬৬ ডলার থাকলেও তা বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং একপর্যায়ে ১১৯ ডলারে গিয়ে ঠেকে। বর্তমানে দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলেও হরমুজ প্রণালির এই টানাপোড়েন বিশ্ব অর্থনীতিতে এখনো মারাত্মক সংকট সৃষ্টি করে চলেছে।

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিকদের মতে, ইরান এখনো হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে। তবে বিকল্প পথ, জাহাজে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ায় সেই নিয়ন্ত্রণ আর পুরোপুরি অপ্রতিরোধ্য নয়। ফলে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াই শুধু সামরিক শক্তির নয়। কে জাহাজের ভয়, তেলবাজারের চাপ ও বাণিজ্যের প্রবাহকে বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সেটিও এখন যুদ্ধের বড় প্রশ্ন।

—মাহফুজা মিম অনূদিত ও পরিমার্জিত

আরও