মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে চলমান নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলনের মুখে প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে বিশেষ ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তবে এ ঘোষণাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। আগের মতোই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন তারা। খবর রয়টার্স।
বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে মোদি বলেন, ‘আমাদের তরুণদের কল্যাণ ও ভবিষ্যতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই।’ তিনি জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে সরকার ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তরুণদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার চেষ্টা যারা করবে, তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
ভারতে বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন করা হয়। অতীতে নারী ও শিশু নির্যাতন, সন্ত্রাসবাদ, অর্থপাচার এবং জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে এ ধরনের আদালত ব্যবহৃত হয়েছে।
তবে আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগে সন্তুষ্ট নন। সিজেপির মুখপাত্র আশুতোষ রানকা বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের পর আদালতে বিচার হওয়া সমস্যার কেবল একটি অংশ। তার প্রশ্ন, ‘মোদি-জি, আগে বলুন তো, এ দেশে বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে কেন?’ তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন ইস্যুতেই দেশে ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত গঠন করা হয়েছে, কিন্তু সেগুলো সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে পেরেছে কি না—এর উত্তর সরকারও জানে, জনগণও জানে। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা না দেয়া এবং পুলিশি হয়রানি বন্ধের দাবিও জানান তিনি।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বলেন, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীও মোদির ঘোষণায় সন্তুষ্ট নন। তার দাবি, দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মোদি সরকারের আমলেই। বৃহস্পতিবারও বিরোধী সাংসদরা সংসদ ভবনের বাইরে প্ল্যাকার্ড হাতে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। পরে সংসদের ভেতরেও একই দাবিতে হট্টগোল করে কার্যক্রম বারবার স্থগিত করতে বাধ্য করেন।
অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও তাদের মিত্র দলের সাংসদরা পাল্টা বিক্ষোভ করে প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুতে সংসদে আলোচনার দাবি জানান। সরকারের মন্ত্রীরা অভিযোগ করেন, বিরোধীরা প্রকৃতপক্ষে আলোচনায় আগ্রহী নয়; তারা ইচ্ছাকৃতভাবে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত করছে। এই পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবারও সংসদের উভয় কক্ষে তুমুল হট্টগোল হয়। বিরোধীদের বিক্ষোভে চলতি সপ্তাহে চতুর্থ দিনের মতো সংসদের কার্যক্রম বারবার স্থগিত করতে হয়।
স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার গভীর রাতে দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনের কেন্দ্রস্থলে ১০ হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হন। দিল্লি পুলিশের দাবি, এ সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে পাথর ও প্লাস্টিকের বোতল নিক্ষেপ করলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন এবং তাদের হাসপাতালে নেয়া হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরেও হাজারো বিক্ষোভকারী যন্তর মন্তরে অবস্থান নেন। সরকারবিরোধী পোস্টার ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেই তাদের অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে।
নিরাপত্তাজনিত কারণে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন কেন্দ্রীয় দিল্লি ও আশপাশের ১৬টি মেট্রো স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করেছে। চলতি সপ্তাহে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দ্বিতীয়বারের মতো এতগুলো স্টেশন একযোগে বন্ধ করা হলো, এতে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো যাত্রী।
ক্রমবর্ধমান আন্দোলনের চাপের মুখে এরই মধ্যে সিজেপি নেতাদের সঙ্গে এক দফা বৈঠক করেছে মোদি সরকার। বৈঠকে আন্দোলনকারীদের দাবি বিবেচনার আশ্বাস এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।