একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে কয়েক শ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়ায় নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হতে পারে। প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এ কথা জানিয়েছেন। একই তথ্য জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)।
চীনের তিব্বতের সীমান্তবর্তী হিমালয় এলাকায় কাদা ও পাথরের বিশাল স্তূপ নদীতে ধসে পড়ার পর ভয়াবহ বন্যা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন শহর ও উপত্যকায়। এ ঘটনায় ১৬২ জন নিহত হয়েছেন। আজ সকালেও নেপালে উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টার ব্যবহার করে নিখোঁজ কয়েকশ মানুষের সন্ধান চালান।
নেপালের পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ৫৭৯ পর্যটকের মধ্যে ৪০০ জনের বেশি বিদেশী। দুর্যোগটি এমন একটি এলাকায় আঘাত হেনেছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক পর্যটক, পর্বতারোহী ও তীর্থযাত্রী যাতায়াত করেন। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে কাদাধসের ঘটনায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশী নাগরিক। তবে নেপাল ও চীনের দেয়া নিখোঁজের হিসাবের মধ্যে একই ব্যক্তিরা রয়েছেন কিনা, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুসারে, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ওই অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হওয়ার খবর প্রথমে জানায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)। সংস্থাটি প্রাথমিকভাবে এটিকে কাঠমান্ডুর উত্তরে নেপাল-চীন সীমান্ত এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে শনাক্ত করেছিল। পরে ইউএসজিএস জানায়, ওই কম্পন আসলে কোনো ভূমিকম্পের কারণে হয়নি। বরং অত্যন্ত শক্তিশালী ওই ভূমিধসের কারণেই কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল। এর তীব্রতা ভূমিকম্পের হিসাবে ৫ দশমিক ২ মাত্রার সমতুল্য ছিল।
রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, গিরংয়ের একটি সীমান্ত পারাপার এলাকায় পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত বহু মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ওই স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্পও ধ্বংস হয়।
প্ল্যানেট ল্যাবসের আগে ও পরের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, সবুজে ঢাকা পাহাড়ের একটি বড় অংশ এখন বাদামি ধ্বংসাবশেষ ও পলিতে ঢেকে গেছে।
ভারতের সিকিম ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ বিক্রম গুপ্ত রয়টার্সকে বলেন, ‘হিমবাহের সম্মুখভাগের একটি বড় অংশ ধসে পড়েছিল—এটি নিশ্চিত। এর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পাথর ও পলি যুক্ত হয়ে থাকতে পারে।’
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির সহযোগী অধ্যাপক ও ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার বলেন, স্যাটেলাইট চিত্রে দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ তুষার গলে যাওয়ার চিত্র দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, উপত্যকার কিছু হিমবাহ আগের দিন তুষারে ঢাকা ছিল, কিন্তু পরদিন সেগুলোয় মূলত খালি বরফ দেখা গেছে। তার ধারণা, আবহাওয়া সম্ভবত উষ্ণ ছিল।
জাতিসংঘের ২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে নেপালের তুষারঢাকা পাহাড়গুলো মাত্র ৩০ বছরের কিছু বেশি সময়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বরফ হারিয়েছে। একই বছর সংস্থাটি জানিয়েছিল, ভারত ও চীনের মতো দুটি বড় কার্বন নিঃসরণকারী দেশের মাঝখানে অবস্থিত নেপালের হিমবাহগুলো আগের দশকের তুলনায় পরবর্তী দশকে ৬৫ শতাংশ বেশি দ্রুত গলেছে।
শুগার বলেন, প্ল্যানেট ল্যাবসের বৃহস্পতিবার সকালের স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে পড়েছে এবং প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকার তলদেশে আছড়ে পড়েছে।
তবে নির্মাণকাজও এ ঘটনায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো ভূমিকা ছিল কিনা, তা ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখা হবে বলেও জানান তিনি।
নেপালে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পার্বত্য জেলা রাসুয়ায় বেশ কয়েকটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। জেলাটির জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার।
নেপালের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি জানিয়েছে, একটি ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে ‘হিমবাহ-সম্পৃক্ত বন্যা’ সৃষ্টি হয়। নেপাল-চীন সীমান্তের একটি পারাপারস্থল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে এই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে।
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (আইসিমড) জানিয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে বন্যা, ভূমিধস, তুষারধস ও খরার ঘটনা দিন দিন বেশি ঘন ঘন এবং তীব্র হয়ে উঠছে। একইসঙ্গে পানি, ভূমি ও বায়ুর দ্রুত পরিবর্তন এ অঞ্চলের মানুষের জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে।
সংস্থাটি বুধবার জানিয়েছে, আকস্মিক বন্যার প্রবল স্রোত পানি, পলি ও বড় বড় পাথর নিয়ে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বয়ে যায়। নদীর নিম্নাঞ্চলে গালছি এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার (৩০ ফুট) পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।