কেন বারবার নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে নেপালের অবকাঠামো

দুর্যোগের পর কাঠমান্ডুর বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় থেকে বরাবরের মতোই ঘটনাটিকে ‘নজিরবিহীন’ বা ‘অপ্রত্যাশিত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে পরিবেশবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রিধারী গবেষক সন্দীপ জোশীর মতে, একই এলাকায় এক দশকের মধ্যে একাধিকবার ভয়াবহ দুর্যোগ হলে তাকে আর শুধু অপ্রত্যাশিত ঘটনা বলা যায় না। বরং এ ধরনের ঘটনা অবকাঠামো পরিকল্পনার দুর্বলতা তুলে ধরে।

হিমালয়কন্যা নেপালের নদীগর্ভে বারবার অবকাঠামো তলিয়ে যাওয়া কেবল প্রকৃতির স্বাভাবিক কোনো ঘটনা নয়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এ যুগে পুরোনো গড় পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন প্রকল্প নকশা করাই এর প্রধান কারণ। দেশের সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে অতীতের গড় বৃষ্টিপাত ও নদীর পানিপ্রবাহের হিসাব ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু চরম আবহাওয়া মোকাবিলায় এসব হিসাব যথেষ্ট নয়।

গত বুধবার (২৬ আগস্ট) উত্তর রাসুয়া জেলার ভোতেকোশি নদীতে হঠাৎ নেমে আসা ১০ মিটার উঁচু পানির ঢল এ সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। আকস্মিক এ বন্যায় তিমুর ও স্যাব্রুবেসির অসংখ্য বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটের সেতু, পুলিশ ফাঁড়ি, জলবিদ্যুৎ স্থাপনা এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভ্যাট ও কাস্টমস অবকাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

দুর্যোগের পর কাঠমান্ডুর বিভিন্ন সরকারি মন্ত্রণালয় থেকে বরাবরের মতোই ঘটনাটিকে ‘নজিরবিহীন’ বা ‘অপ্রত্যাশিত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তবে পরিবেশবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রিধারী গবেষক সন্দীপ জোশীর মতে, একই এলাকায় এক দশকের মধ্যে একাধিকবার ভয়াবহ দুর্যোগ হলে তাকে আর শুধু অপ্রত্যাশিত ঘটনা বলা যায় না। বরং এ ধরনের ঘটনা অবকাঠামো পরিকল্পনার দুর্বলতা তুলে ধরে।

সম্প্রতি দ্য কাঠমান্ডু পোস্টে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক কলামে জোশী লিখেছেন, নেপালের অবকাঠামো এমন একটি জলবায়ুকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে, যার অস্তিত্ব এখন আর নেই। তার মতে, দেশটির জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা, সড়ক সম্প্রসারণের নকশা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গড় তাপমাত্রা, বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ও নদীর গড় পানিপ্রবাহকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে এসব তথ্য কাজে লাগলেও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি নির্ধারণে তা যথেষ্ট নয়।

পাঁচ বছরের প্রকল্পের বাজেট তৈরি করতে গড় হিসাব সুবিধাজনক। কিন্তু নেপালের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতিতে এ ধরনের হিসাব বড় ভুলের কারণ হতে পারে। রাসুয়া বা অন্য পাহাড়ি এলাকায় সড়ক ও সেতু সাধারণত স্বাভাবিক বর্ষার বৃষ্টিতে ভেঙে পড়ে না। বড় বিপর্যয় ঘটে যখন উজান থেকে হঠাৎ পাহাড়ি ঢল নেমে আসে। হিমবাহের হ্রদ ভেঙে যাওয়া, অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলের কারণে অল্প সময়ের মধ্যে সরু গিরিখাতে বিপুল পানি প্রবাহিত হতে পারে।

জোশীর মতে, হিমালয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং স্বাভাবিক আবহাওয়া ও চরম আবহাওয়ার মধ্যে ব্যবধানও বাড়ছে। ফলে অতীতের গড় হিসাব ধরে তৈরি অবকাঠামো বড় ধরনের বন্যার সময় সহজেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।

বর্তমানে নেপালের প্রকৌশলীরা যে সড়ক বা সেতু তৈরি করেন, তা মূলত ৯০ শতাংশ স্বাভাবিক সময়কে মাথায় রেখে নকশা করা হয়। কিন্তু জলবায়ুর চরম বিপর্যয়ের দিনে এ নকশা কার্যকর থাকে না। পানির প্রবল চাপ সামলাতে না পেরে তখন কালভার্ট ভেঙে পড়ে, গাইডওয়াল ধসে যায় এবং নতুন নির্মিত সেতু মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে।

একই হিসাব ব্যবহার করে প্রতি বছর একই স্থানে সেতু বা সড়ক পুনর্নির্মাণ করলে সরকারি অর্থের অপচয় হয়। একই সঙ্গে মানুষের জীবন ও জীবিকার ঝুঁকিও থেকে যায়। এ চক্র থেকে বের হতে জোশী তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা বলেছেন।

প্রথমত, পাহাড়ি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গড় হিসাবনির্ভর অবকাঠামো পরিকল্পনা বন্ধ করতে হবে। প্রকল্পের নকশায় চরম বন্যা ও অস্বাভাবিক পানির প্রবাহের ঝুঁকি যুক্ত করতে হবে। প্রকল্প অনুমোদনের আগে বড় ধরনের দুর্যোগে সেটি কতটা টিকে থাকতে পারবে, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও পরিকল্পনা সংস্থাগুলোর প্রকল্প মূল্যায়নের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। স্বাভাবিক আবহাওয়ায় কোনো প্রকল্প কতটা সুফল দিয়েছে, শুধু তা দিয়ে সাফল্য নির্ধারণ করা উচিত নয়। বড় বন্যা বা ভূমিধসের মতো দুর্যোগে প্রকল্পটি কতটা টেকসই থাকে, সেটিও মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া দরকার।

তৃতীয়ত, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে দুর্যোগের পর উদ্ধারকাজে বেশি নির্ভরশীল না হয়ে আগাম পদক্ষেপ নিতে হবে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বা উজানে পানির উচ্চতা বাড়ার সংকেত পাওয়া গেলে দ্রুত সতর্কবার্তা দিতে হবে। একই সঙ্গে আগাম অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে মানুষ ও সম্পদ রক্ষায় দুর্যোগের আগেই ব্যবস্থা নেয়া যায়।

সন্দীপ জোশীর মূল বার্তা হলো, নেপালের অবকাঠামো রক্ষায় শুধু স্বাভাবিক পরিস্থিতির হিসাব যথেষ্ট নয়। নদীর চরম রূপ ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার ঝুঁকি মাথায় রেখে নতুনভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। নইলে একই জায়গায় বারবার সেতু, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং ধ্বংসের চক্র চলতেই থাকবে।

আরও