চীন-ভারত-রাশিয়া জোট গঠনের পথ খুলে দেবে ট্রাম্পের নীতি?

ট্রাম্পের নীতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের নতুন টানাপড়েনই তৈরি করছে না, বরং চীন-ভারত-রাশিয়া সমন্বয়ের সম্ভাবনাকেও উসকে দিচ্ছে।

রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনার জেরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কে দিল্লি-ওয়াশিংটনের বহু বছরের কৌশলগত সম্পর্ক প্রবল পরীক্ষার মুখে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই চাপ ভারতের জন্য এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করবে যেখানে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গেও দিল্লি ঘনিষ্ঠতার পথ খুঁজতে পারে। যে সেতুবন্ধনে রাশিয়ার ভূমিকাও জুড়ে যাবে অবধারিতভাবে।

১৯৯৮ সালে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভগেনি প্রিমাকভ রাশিয়া, ভারত ও চীনের ত্রিমুখী জোট গড়ার যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন তা যেন বহুদিনের ঘুম ভেঙে আবার চোখ মেলতে চলেছে। মার্কিন একমেরুকেন্দ্রিক প্রভাবের পাল্টা ভারসাম্য গড়ার উদ্দেশে জন্ম নেয়া সেই ধারণা ২০০০-এর দশকে কিছুটা অগ্রসর হলেও, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আর ২০২০ সালের চীন–ভারত সীমান্ত সংঘর্ষে তা যেন গভীর হিমঘরে বন্দি হয়ে যায়। কিন্তু এখন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক-ঝড় ও কূটনৈতিক চাপের আবর্তে, পুরনো সেই ত্রিভুজ আবারও নতুন প্রাণ পেতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল কেনার জেরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কে দিল্লি-ওয়াশিংটনের বহু বছরের কৌশলগত সম্পর্ক প্রবল পরীক্ষার মুখে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই চাপ ভারতের জন্য এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করবে যেখানে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের সঙ্গেও দিল্লি ঘনিষ্ঠতার পথ খুঁজতে পারে। যে সেতুবন্ধনে রাশিয়ার ভূমিকাও জুড়ে যাবে অবধারিতভাবে। দৃশ্যপট অনেকটাই ১৯৯৮ সালের পারমাণবিক পরীক্ষার পর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সময়কার কূটনৈতিক সঙ্কটের মতো।

গত বুধবার ভারতীয় পণ্যে ২৫ পাল্টা শুল্কের (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) পরও আরো অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন ট্রাম্প। ফলে দেশটির ওপর মোট শুল্কের হার দাঁড়াল ৫০ শতাংশে। যা যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। নয়াদিল্লি এই পদক্ষেপকে ‘অন্যায্য’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, জ্বালানি তেল ক্রয় বাজার পরিস্থিতি ও ১৪০ কোটি মানুষের জ্বালানি চাহিদার কারণে, রাজনৈতিক কারণে নয়।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এখনই একেবারে ভেঙে পড়বে না, কিন্তু অগ্রগতি নিঃসন্দেহে ধীর হবে। চীনের প্রভাব মোকাবিলায় যে কৌশলগত চুক্তিগুলো দুই দেশকে কাছে আনছিল, সেগুলো এখন অনিশ্চিত। এই অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে ভারত বিকল্প হিসেবে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে, এমনকি চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে—যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে বড় কূটনৈতিক ধাক্কা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারতের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে জোটবদ্ধ যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু নতুন শুল্ক নীতি সেই অক্ষকেই টলিয়ে দিতে পারে।

আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, চলতি মাসের শেষে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনে যেতে পারেন। সাত বছরেরও বেশি সময় পর দুই দেশের শীর্ষ নেতার সরাসরি বৈঠক হতে পারে। সীমান্ত সংঘর্ষের পর ২০২০ সাল থেকে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ জমেছিল , এ বছর তা কিছুটা গলতে শুরু করেছে। পুনরায় শুরু হয়েছে মানস সরোবর যাত্রা ও পর্যটক ভিসা প্রদান।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে ভারত যদি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের উদ্যোগ নেয়, তবে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কও নতুন মাত্রা পাবে। ইতিমধ্যে পুতিনের এ বছর দিল্লি সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দূরত্ব বেড়ে গেলে মস্কো ‘রাশিয়া-ভারত-চীন’ ত্রিপক্ষীয় বলয় পুনরুজ্জীবিত করার সুযোগ খুঁজবে এবং প্রতিরক্ষা খাতে নতুন যৌথ প্রকল্পের প্রস্তাব রাখবে।

এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকে সতর্ক করে জাতিসংঘ নিযুক্ত সাবেক মার্কিন দূত নিকি হ্যালি বলেছেন, ‘চীনের প্রতি নরম হয়ে ভারতের মতো শক্তিশালী মিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা উচিত নয়।’

এরই মধ্যে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আঘাত সরাসরি প্রভাব ফেলছে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ওপর। যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন অস্ত্র ও যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত করেছে নয়া দিল্লি। ভারতের অন্তত তিনজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মার্কিন শুল্ক আরোপের পর এটাই ভারতীয় অসন্তুষ্টির প্রথম সুস্পষ্ট পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে মস্কোও সুযোগ খুঁজছে। রাশিয়া ভারতের সঙ্গে নতুন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, যেমন এস-৫০০ ভূমি থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিক্রির বিষয়ে প্রস্তাব দিচ্ছে বলে ভারতীয় ও রুশ সূত্র জানিয়েছে।

কার্নেগি এনডাউমেন্টের সিনিয়র ফেলো অ্যাশলি টেলিস মনে করেন, ‘ভারত এখন এক ফাঁদে আছে। ট্রাম্পের চাপে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি কমাবে, কিন্তু প্রকাশ্যে তা স্বীকার করলে বিষয়টি এমন দাঁড়াবে যেন সে ট্রাম্পের ব্ল্যাকমেইলের শিকার। এই পরিস্থিতি অযথা এমন এক সংকট তৈরি করতে পারে যা গত ২৫ বছরের কূটনৈতিক সাফল্যকে উল্টে দেবে।’

চীন-রাশিয়া-ভারত জোটের হচ্ছে কিনা তা সামনের দিনগুলোতে আরো স্পষ্ট হবে বলে মনে করে এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ফারওয়ার আমের। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য আলোচনার পরবর্তী রাউন্ডে কী হবে সেটার ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছ। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও অবশ্যই ভারতের কৌশলগত গুরুত্বকে চীনের পাল্টা শক্তি হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্ক আরো টানাপড়েনে পড়ে, তবে তা কেবল চীনকে তার প্রভাব বজায় রাখতে এবং প্রসারিত করতে সাহায্য করবে। এটি ভারতের জন্যও একটি শক্ত যুক্তি তৈরি করে যে, তাদের নিজস্ব চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা উচিত।’

অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক আলেকসেই জাখারোভের মতে, ‘ভারত নিঃসন্দেহে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে একটি সমঝোতা খোঁজার চেষ্টা করবে। কিন্তু সেখান থেকে ইতিবাচক কিছু না পেলে এটা নিশ্চিত যে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার ফাটলকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে রাশিয়া।’

সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের নীতি শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের নতুন টানাপড়েনই তৈরি করছে না, বরং চীন-ভারত-রাশিয়া সমন্বয়ের সম্ভাবনাকেও উসকে দিচ্ছে। এটি বাস্তবায়িত হলে এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে—যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলই নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য হবে।

আরও