আগামী ছয় মাসে ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাবে বিশ্বজুড়ে চার লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু সংকটের কারণে ইতিমধ্যে বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর সঙ্গে এ অতিরিক্ত প্রাণহানিও যুক্ত হবে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
সম্প্রতি এ পূর্বাভাস দিয়েছে বৈশ্বিক জলবায়ু সর্ম্পকিত ঝুঁকি বিশ্লেষকদের নেটওয়ার্ক ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব। সংগঠনটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের জন্য এ মৃত্যুর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। জুন বা জুলাই পর্যন্ত তাপজনিত মৃত্যুর উচ্চহার অব্যাহত থাকতে পারে। তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও সুপেয় পানির সংকটও আরও তীব্র হতে পারে। গবেষকদের মতে, এবারের এল নিনো ‘ভবিষ্যতের পোস্টকার্ড’। কারণ এর প্রভাবে তাপমাত্রা এমন পর্যায়ে উঠছে, যা আগামী ২০ বছরে জলবায়ু সংকটের কারণে দেখা যেতে পারে বলে পূর্বাভাস ছিল।
আগামী ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে থাকবে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়া। দেশটিতে ৩১ হাজার ৪০০ মানুষের অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় এর পরেই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া ও সুদান। নাইজেরিয়া, সুদান, নাইজার ও চাদসহ আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে মোট ৬৬ হাজার ৮০০ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে। অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় সম্মিলিতভাবে আরও ১৯ হাজার ৪০০ অকালমৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রথম ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। দেশটিতে প্রায় সাড়ে তিন হাজার অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির অন্যতম সহলেখক ও শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ‘৪ লাখ ৫১ হাজার সংখ্যাটা এত বড় যে আমাদের অনুভূতিশূন্য করে তুলতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এরা প্রত্যেকেই রক্তমাংসের মানুষ; এর মধ্যে আছেন কারও বাবা-মা, সন্তান, দাদা-দাদি কিংবা প্রতিবেশী, যারা প্রতিদিনের মতো কাজে যাচ্ছিলেন, সাধারণ জীবনযাপন করছিলেন।’
বিজ্ঞানীরা অঞ্চলভিত্তিক অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর হিসাব করেছেন। এতে কোন এলাকায় কী ধরনের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে আগাম তাপদাহের পূর্বাভাস দেয়া, কুলিং সেন্টার স্থাপন, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত জনবল রাখা এবং রোদে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
গত সোমবার বর্তমান এল নিনো ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙেছে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রায় পৌঁছানোর কথা ছিল আরো কয়েক মাস পর। আগের এল নিনোর তুলনায় এবার তাপমাত্রা এত বেশি যে বিজ্ঞানীরা একে ‘বিস্ময়কর’ ও ‘গডজিলা-স্তরের’ বলে বর্ণনা করছেন। এল নিনো প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর তীব্রতা আরো বাড়তে পারে।
এল নিনোর প্রভাবে খাদ্য সরবরাহও ব্যাহত হতে পারে। আগস্টে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে জানিয়েছিল, এর প্রভাবে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে এবং খাদ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। ১৮৭৭-৭৮ সালের একটি বড় এল নিনোর কারণে খরা ও দুর্ভিক্ষে পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ওই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভারত, ব্রাজিল ও চীন।