কাতার ও ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। পরমাণু স্থাপনায় মার্কিন হামলার প্রতিশোধ নিতেই গতকাল রাতে ইরাকের বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি ও কাতারের রাজধানী দোহার আল-উদেইদ এয়ার বেজে ‘অ্যানাউন্সমেন্ট অব ভিক্টরি’ নামে সামরিক এ অভিযান চালানো হয় বলে জানিয়েছে তেহরান। এ ঘটনায় কাতারের পাশাপাশি কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, জর্ডান, সিরিয়া, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সবক’টি দেশ তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ ও দেশগুলোয় থাকা প্রবাসীদের নিয়ে উদ্বেগে রয়েছে বাংলাদেশ।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার সরকার। দোহা বলছে, এটি কাতারের সার্বভৌমত্ব, আকাশসীমা ও জাতিসংঘ সনদের সরাসরি লঙ্ঘন। রাষ্ট্র হিসেবে কাতার এ স্পষ্ট আগ্রাসনের জবাবে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার সংরক্ষণ করে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, ‘কাতারের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে ইরানের ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে এবং ঘাঁটি বা শহরে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।’
ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে হামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছে, এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের আগের হামলার প্রতিশোধ। এ হামলা ভ্রাতৃপ্রতিম কাতার বা দেশটির জনগণের বিরুদ্ধে নয়। আবাসিক এলাকা থেকে দূরের মার্কিন ঘাঁটিতে এ হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে বলছে, এ হামলা বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ কাতার বা তার সম্মানিত জনগণের জন্য কোনো হুমকি তৈরি করে না। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান কাতারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উষ্ণ ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনৈতিক চ্যানেলে সতর্ক করেছিল বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরান হামলার আগে কাতারকেও অবহিত করে, যার ফলে কাতার আকাশপথ সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।
এ পূর্ব সতর্কতার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি এড়ানো। নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, ইরান এ কূটনৈতিক সমন্বয় করেছে ‘জনগণের প্রাণনাশ এড়াতে’। হামলার সময়টাও এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল যাতে ঘাঁটিতে সেনা উপস্থিতি কম থাকে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন জানিয়েছে, আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে ইরান স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালিয়েছে। একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত এ হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নাগরিকের হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে ‘খুবই দুর্বল প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। হামলার আগে আগাম সতর্কবার্তা দেয়ায় তেহরানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ইরান আল-উদেইদ বিমানঘাঁটির দিকে ১৪টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল, যার মধ্যে ১৩টি ভূপাতিত করা হয়। অপরটি অন্যদিকে চলে যায়, যেটি কোনো ক্ষতি করেনি। কোনো আমেরিকান হতাহত হয়নি এবং ঘাঁটিতে খুব সামান্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইরান সম্ভবত তাদের ক্রোধ ঝেরে ফেলেছে। আশা করি আর কোনো বিদ্বেষ থাকবে না। আলোচনায় ফিরে আসবে।’
কাতারে হামলার বিষয়টি ইরান পুরোপুরি স্বীকার করলেও ইরাকের হামলার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি। বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, এমনও হতে পারে সেখানে ইরান সরাসরি হামলা চালায়নি। ইরানঘনিষ্ঠ প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো বিচ্ছিন্নভাবে হামলা চালিয়ে থাকতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের এ হামলায় সংঘর্ষ শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে। জ্বালানির দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়তে পারে এবং দেখা দিতে পারে বৈশ্বিক মন্দা।
ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণার পর গুরুত্বপূর্ণ ওই পথে জাহাজ চলাচল সীমিত পর্যায়ে নেমে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ব্যবসা থেকে কাতার নিজেদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সীমিত করলে তা বাংলাদেশের এলএনজি খাতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কেননা মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি থেকেই প্রচুর পরিমাণে এ জ্বালানি পণ্য আমদানি করা হয়।
এলএনজি আমদানির বিষয়টি দেখভাল করে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির সাবসিডিয়ারি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, কাতার গ্যাসের কাছ থেকে চলতি অর্থবছরে মোট ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪ কার্গো দেশে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কার্গো আমদানির মাধ্যমে কাতার থেকে ২ হাজার ৯৩ মিলিয়ন টন এলএনজি দেশে এসেছে। বাকি কার্গো আমদানির কার্যক্রম চলমান।
কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি করছে পেট্রোবাংলা। এ পর্যন্ত জ্বালানি পণ্যটি আমদানি করা হয়েছে মোট ২৬৭ কার্গো। আগামী বছর থেকে কাতারের এলএনজি আরো আমদানির জন্য দ্বিতীয় দফায় চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। ফলে আগামীতে গ্যাস সরবরাহে নির্ভরযোগ্য হিসেবে কাতারকেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বড় বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। সরবরাহ সংকট ও দামে উল্লম্ফন হলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া বড়ই কঠিন হবে। বিশেষত কাতারে যে সংকটের কথা শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশ সেখান থেকে বড় আকারে এলএনজি আমদানি করে। এ সরবরাহ চ্যানেল বন্ধ হলে বাংলাদেশে গ্যাস সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিতে পারে।’
চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন কর্তৃপক্ষ সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে। সংশ্লিষ্ট দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত দোহা, দুবাই, আবুধাবি, কুয়েত ও বাহরাইন হয়ে আগমন ও বহির্গমনকারী সব বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাতিল থাকবে।
এ পরিস্থিতিতে ওই রুটগুলোয় ভ্রমণের পরিকল্পনায় থাকা যাত্রীদের নিজ নিজ এয়ারলাইনস অফিসের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ করতে অনুরোধ করা হয়েছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনস অফিসে যোগাযোগ করে পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী ভ্রমণের সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে গতকাল রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে।
এভিয়েশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রুটে প্রতিদিন কয়েক হাজার যাত্রী যাতায়াত করে। এসব দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে অন্য দেশের গন্তব্যেও অনেক ফ্লাইট যাতায়াত করে। দেশগুলো নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ায় প্রবাসীরা বিপাকে পড়বেন।
এদিকে কাতার সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ করায় এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশ থেকে কাতারের মধ্যে ফ্লাইট চলাচলে। ঘোষণার পর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট ওমানের মাসকাটে অবতরণ করে। পরিববর্তন করা হয় বিমানের জেদ্দাগামী আরেকটি ফ্লাইটের রুট। এছাড়া ফিরিয়ে আনা হয়েছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট। কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইট চলাচলও বিঘ্নিত হচ্ছে।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস কাতারে প্রতিদিন একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করে। অন্যদিকে কাতার এয়ারওয়েজ ঢাকা থেকে প্রতিদিন দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) এবিএম রওশন কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিমানের একটি ফ্লাইট সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে কাতারের দোহার উদ্দেশে যাত্রা করে। কাতার আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়ায় ফ্লাইটটি ওমানের মাসকাটে অবতরণ করেছে। সেখান থেকে রিফুয়েলিং করে ফিরিয়ে আনা হবে। অন্যদিকে সোমবার দিবাগত রাত দেড়টার একটি ফ্লাইট রয়েছে, যেটি দোহায় ট্রানজিট করে সৌদি আরবের জেদ্দায় যাবে। এ ফ্লাইটে দোহায় ট্রানজিট বাতিল করা হয়েছে।’
ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে কাতারের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর মাঝপথ থেকে ফিরে আসার কথা জানিয়েছেন এয়ারলাইনসটির মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম। ঢাকা থেকে কাতারের মধ্যে বিমান, ইউএস-বাংলা ছাড়াও কাতার এয়ারওয়েজে প্রতিদিন দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করে। ঢাকা বিমান সূত্রে জানা গেছে, আকাশসীমা বন্ধের প্রভাব কাতার এয়ারওয়েজেও পড়েছে। বাংলাদেশ থেকে কাতার এবং কাতার হয়ে বিভিন্ন গন্তব্যের ট্রানজিট যাত্রীরা এতে ভোগান্তিতে পড়েছে।