গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পরও বিভক্তির বৃত্তে লিবিয়া

২০১৪ সালে বিরোধ নতুন গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এর মধ্য দিয়ে দেশটি পূর্ব ও পশ্চিম—দুটি প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। বর্তমানে রাজধানী ত্রিপোলিতে প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দিবেইবার নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ স্বীকৃত গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি বা জিএনইউ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমাঞ্চলের ওপর এ সরকারের কর্তৃত্ব থাকলেও সেখানে সক্রিয় বিভিন্ন মিলিশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে তাকে ক্ষমতা ধরে রাখতে হচ্ছে

২০১১ সালের আগে আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল লিবিয়া। বিপুল জ্বালানি তেল ও গ্যাসসম্পদ, তুলনামূলক উচ্চ মাথাপিছু আয় এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতে রাষ্ট্রীয় ভর্তুকির কারণে দেশটির নাগরিকরা উন্নত জীবনযাপন করতেন। কিন্তু মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর সেই লিবিয়া আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। দেড় দশক ধরে রাজনৈতিক বিভাজন, গৃহযুদ্ধ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান, বিদেশী শক্তির হস্তক্ষেপ এবং তেলসম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে প্রায় অকার্যকর করে রেখেছে। গাদ্দাফিবিরোধী অভ্যুত্থানের ১৫ বছর পর এখন যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, মিসর ও কাতারসহ কয়েকটি দেশ আবার ‘এক লিবিয়া’ গঠনের চেষ্টা করছে। তবে এ উদ্যোগ দেশটিকে সত্যিকার অর্থে ঐক্যবদ্ধ করবে, নাকি নতুন করে ক্ষমতা ভাগাভাগির আরেকটি অস্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

মুয়াম্মার গাদ্দাফি ১৯৬৯ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজা ইদ্রিসকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন। পরবর্তী ৪২ বছর তিনি লিবিয়া শাসন করেন। গাদ্দাফির শাসন ছিল কর্তৃত্ববাদী। দেশে কার্যকর বহুদলীয় রাজনীতি, স্বাধীন নির্বাচন কিংবা মতপ্রকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল না। বিরোধী রাজনীতি কঠোরভাবে দমন করা হতো। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, মানবাধিকারকর্মী ও সরকারের সমালোচকদের গ্রেফতার, নির্যাতন ও গুম করার অভিযোগও ছিল। তবে একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের বিপুল আয় ব্যবহার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাদ্যে বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি দেয়া হতো।

গাদ্দাফির পতন লিবিয়ায় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর যে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল, তা দেশটিতে ছিল না

গাদ্দাফি আমলে লিবিয়ায় শিক্ষার প্রসার, নারীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ এবং সাক্ষরতার হারে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছিল। জনগণের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের বড় ভূমিকা ছিল। জ্বালানি তেলের আয় ও কম জনসংখ্যার কারণে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে দেশটি আফ্রিকার শীর্ষ দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়। অবকাঠামো উন্নয়নেও বড় প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। মরুভূমির নিচে থাকা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তরের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় পৌঁছে দিতে নির্মিত ‘গ্রেট ম্যান-মেড রিভার’ ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পানি সরবরাহ প্রকল্প।

তবে এ সমৃদ্ধির ভিত ছিল দুর্বল। অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি তেলনির্ভর ছিল এবং শক্তিশালী বেসরকারি খাত গড়ে ওঠেনি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের বাইরে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে পারেনি। সেনাবাহিনী, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল, যাতে কোনো বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র তৈরি না হয়। ফলে গাদ্দাফির পতনের পর দেশ পরিচালনার মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান কিংবা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব অবশিষ্ট ছিল না।

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরব বসন্তের প্রভাবে বেনগাজিতে গাদ্দাফিবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সহিংসতার মুখে আন্দোলন দ্রুত সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। পরিস্থিতি একপর্যায়ে গৃহযুদ্ধে গড়ায়। বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার যুক্তিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ লিবিয়ায় উড্ডয়ন নিষিদ্ধ এলাকা কার্যকরের অনুমোদন দেয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে ন্যাটো বাহিনী গাদ্দাফির সামরিক স্থাপনা ও বাহিনীর ওপর বিমান হামলা শুরু করে।

মুয়াম্মার গাদ্দাফি। ছবি: রয়টার্স

ন্যাটোর সহায়তায় বিদ্রোহীরা দ্রুত অগ্রসর হয়ে ২০১১ সালের আগস্টে রাজধানী ত্রিপোলি দখল করে। ওই বছরের ২৩ আগস্ট গাদ্দাফির প্রধান ক্ষমতাকেন্দ্র বাব আল-আজিজিয়া কম্পাউন্ড বিদ্রোহীদের হাতে চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তার সরকারের কার্যত পতন ঘটে। ২০ অক্টোবর নিজ শহর সির্তে বিদ্রোহীদের হাতে আটক হওয়ার পর নিহত হন তিনি। এর তিনদিন পর ২৩ অক্টোবর লিবিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মুক্ত’ ঘোষণা করা হয়।

গাদ্দাফির পতন লিবিয়ায় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। কিন্তু একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর যে রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি প্রয়োজন ছিল, তা দেশটিতে ছিল না। গাদ্দাফিবিরোধী যুদ্ধে অংশ নেয়া বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আদর্শিক সশস্ত্র গোষ্ঠী অস্ত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব এলাকা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি হয়। কেন্দ্রীয় সরকার এসব বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়।

২০১৪ সালে বিরোধ নতুন গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। এর মধ্য দিয়ে দেশটি পূর্ব ও পশ্চিম—দুটি প্রধান রাজনৈতিক ও সামরিক শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। বর্তমানে রাজধানী ত্রিপোলিতে প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দিবেইবার নেতৃত্বাধীন জাতিসংঘ স্বীকৃত গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল ইউনিটি বা জিএনইউ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে পশ্চিমাঞ্চলের ওপর এ সরকারের কর্তৃত্ব থাকলেও সেখানে সক্রিয় বিভিন্ন মিলিশিয়ার সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে তাকে ক্ষমতা ধরে রাখতে হচ্ছে।

দেশটিতে এখনো আফ্রিকার বৃহত্তম প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা ২০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায় লিবিয়ার ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন। এজন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগের পথে সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক বিভাজন

অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলে রয়েছে তবরুকভিত্তিক প্রতিনিধি পরিষদ-সমর্থিত সমান্তরাল প্রশাসন। এর প্রধান সামরিক শক্তি খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এলএনএ। হাফতারের বাহিনী বেনগাজিসহ পূর্বাঞ্চল, দক্ষিণের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং দেশের অধিকাংশ প্রধান তেলক্ষেত্র ও রফতানি টার্মিনালের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। বাহিনীটি রাশিয়া, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সহযোগিতা পেয়েছে। অন্যদিকে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের প্রধান বিদেশী সমর্থক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে তুরস্ক।

দীর্ঘ সংঘাত লিবিয়ার সম্ভাবনাময় অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশটির মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। সংঘাত না হলে একই সময়ে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারত। রাজনৈতিক বিরোধের কারণে বিভিন্ন সময়ে জ্বালানি তেলক্ষেত্র ও রফতানি টার্মিনাল বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে উৎপাদন ও সরকারি আয় ব্যাপক ওঠানামা করেছে। অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি সরবরাহ ও অন্যান্য জনসেবার মানও কমেছে।

দেশটিতে এখনো আফ্রিকার বৃহত্তম প্রমাণিত জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। বর্তমানে দৈনিক প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তা ২০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করতে চায় লিবিয়ার ন্যাশনাল অয়েল করপোরেশন। এজন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগের পথে সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক বিভাজন। তেল চুক্তির আন্তর্জাতিক বৈধতার জন্য ত্রিপোলির স্বীকৃত সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন হলেও অধিকাংশ তেলক্ষেত্র ও টার্মিনাল হাফতার বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অবস্থিত।

এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়েই লিবিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাসাদ বুলোস এ প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বকে একই সরকারের অধীনে নিয়ে আসা। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার তেল ও গ্যাস খাতে মার্কিন কোম্পানির বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে পারে।

গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পর তাই লিবিয়া বিপরীত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। যে দেশটি একসময় তেলের বিপুল আয়, উচ্চ মাথাপিছু আয় ও রাষ্ট্রীয় জনসেবার কারণে আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ছিল, সেটিই এখন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরশীল। অভিন্ন বাজেট ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা আশার আলো দেখালেও একক সরকার, অভিন্ন সেনাবাহিনী কিংবা জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি

মার্কিন পরিকল্পনাটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকের তথ্যানুযায়ী, প্রস্তাবিত অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় দিবেইবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকতে পারেন। খলিফা হাফতারের ছেলে ও এলএনএর উপপ্রধান সাদ্দাম হাফতারকে পুনর্গঠিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের প্রধান করার আলোচনা রয়েছে। সাদ্দাম হাফতার গত ২৯ জুন ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈঠকে লিবিয়ার সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান একীভূত করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হলো ২০২৬ সালের অভিন্ন জাতীয় বাজেট। গত ১১ এপ্রিল পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিনিধিরা ১৯ হাজার কোটি লিবিয়ান দিনারের, প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারের বাজেটে সম্মত হন। ২০১৩ সালের পর এটিই লিবিয়ার প্রথম অভিন্ন জাতীয় বাজেট। এতদিন দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কার্যত দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসনের ব্যয় নির্বাহ করতে হচ্ছিল। নতুন বাজেট কার্যকর হলে সরকারি অর্থ ব্যয় এবং তেলের আয় বণ্টনে অন্তত একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি তুরস্কও এখন ‘এক লিবিয়া’ নীতির কথা বলছে। তুরস্ক আগে ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারকে সামরিকভাবে সহায়তা করলেও বর্তমানে হাফতার শিবিরের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে আঙ্কারায় বৈঠক করেছেন। পরে ত্রিপোলি ও বেনগাজি সফর করে দিবেইবা ও খলিফা হাফতারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। রাজনৈতিক স্থিতি ফিরলে তুর্কি কোম্পানিগুলো লিবিয়ার নির্মাণ, অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে বড় সুযোগ পেতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে ড্রোন হামলার শিকার লিবিয়ার একটি জ্বালানি সংরক্ষণাগার। ছবি: এপি

মিসর ঐতিহ্যগতভাবে হাফতারের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও এখন ত্রিপোলির সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি কায়রোয় হাফতারের সঙ্গে ঐক্য আলোচনা করেছেন। এর আগে দিবেইবা মিসর সফর করেন এবং দেশটির গোয়েন্দাপ্রধান হাসান রাশাদ ত্রিপোলিতে যান। সীমান্ত নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিস্তার ঠেকাতে একটি স্থিতিশীল লিবিয়া মিসরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কাতার ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখলেও জাতিসংঘের মধ্যস্থতা ও লিবীয়দের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কাতার, মিসর, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যৌথভাবে ২০২৬ সালের অভিন্ন বাজেটকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশগুলো একীভূত শাসনব্যবস্থা ও জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে জাতিসংঘের রোডম্যাপ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছে।

তবে নতুন উদ্যোগ নিয়ে লিবিয়ার ভেতরেই সংশয় রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি জনগণের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পরিবর্তে দিবেইবা ও হাফতার—দুই প্রভাবশালী পরিবারের মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির বন্দোবস্ত হয়ে উঠতে পারে। এতে সাময়িকভাবে সংঘাত কমলেও রাজনৈতিক বংশানুক্রম, দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদ আরো শক্তিশালী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের অনেক গোষ্ঠী হাফতার পরিবারকে জাতীয় নেতৃত্বে মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। আবার পূর্বাঞ্চলেও দিবেইবার ক্ষমতায় থাকা নিয়ে বিরোধিতা রয়েছে।

গাদ্দাফির পতনের ১৫ বছর পর তাই লিবিয়া বিপরীত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। যে দেশটি একসময় তেলের বিপুল আয়, উচ্চ মাথাপিছু আয় ও রাষ্ট্রীয় জনসেবার কারণে আফ্রিকার অন্যতম সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ছিল, সেটিই এখন রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত এবং নিরাপত্তার জন্য সশস্ত্র গোষ্ঠী ও বিদেশী শক্তির ওপর নির্ভরশীল। অভিন্ন বাজেট ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা আশার আলো দেখালেও একক সরকার, অভিন্ন সেনাবাহিনী কিংবা জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিগুলো দুই শিবিরকে একই টেবিলে আনতে পেরেছে বটে; তবে এখনো একক সরকার গঠন, সামরিক বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর একীভূতকরণ এবং জাতীয় নির্বাচনের সময়সূচি নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। এসব বিষয়ে মতৈক্য না হলে ‘এক লিবিয়া’র নতুন উদ্যোগও অতীতের ব্যর্থ শান্তি প্রচেষ্টার তালিকায় যুক্ত হতে পারে।

আরও