হিমালয়ে ভয়াবহ বন্যায় কয়েক সপ্তাহে আগে ধ্বংস হয়ে গেছে নেপাল-চীন সীমান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থলবন্দর। নদী তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকা স্রেফ ধ্বংসাযজ্ঞে পরিণত হয়েছে। এমন এক পরিস্থিতিতেও নিখোঁজ স্বজনদের ফেরার আশায় অপেক্ষা করছেন পরিবারগুলো। প্রতিদিন নিখোঁজ মেয়েকে ফোন ও বার্তা পাঠিয়ে যাচ্ছেন ভারতের নয়াদিল্লির বাসিন্দা অজয় গুপ্ত ও তার স্ত্রী। কিন্তু কোনো উত্তর আসছে না।
গত ২৬ আগস্ট বন্যার দিন নেপালের গিরং বন্দর থেকে শেষবার বাবাকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েছিলেন ৩৩ বছর বয়সী অরুশি গুপ্ত। সীমান্ত পার হয়ে তিব্বতে গিয়ে হিন্দুদের তীর্থস্থান কৈলাস পর্বতে যাওয়ার কথা ছিল তার। শেষ ছবিতে তিনি গিরং পোর্টের ইমিগ্রেশন পোস্টের ছবি পাঠিয়েছিলেন।
এর আগে নিয়মিতই নিজের অবস্থার খবর দিচ্ছিলেন অরুশি। নেপালের একটি হোটেলে দুধ চা পান, ওষুধ খাওয়া, এক সহযাত্রীর পাসপোর্ট আনতে ভুলে যাওয়ায় শেষ মুহূর্তের ঝামেলা—সবই জানিয়েছিলেন তিনি। বন্যার দিন সকালে বাবাকে লিখেছিলেন, ‘সীমান্তে যেতে ১৫ মিনিট হাঁটতে হবে।’
অরুশির বাবা ৬৩ বছর বয়সী অজয় গুপ্ত বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত যে সে সীমান্তের তিব্বত অংশে চলে গেছে এবং কোনো উঁচু জায়গায় নিরাপদে আছে। আমি নিশ্চিত, তার স্বামীও নিশ্চিত, আমার স্ত্রীও নিশ্চিত।’
হিমবাহ ধসে সৃষ্ট বন্যায় পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা ও পাথরের স্রোতে নেপালের সীমান্ত এলাকা বিপর্যস্ত হয়। নেপাল অংশে এখনো ৫ হাজার ১৩০ জন নিখোঁজ বলে জানানো হয়েছে। বন্যায় দেশটিতে অন্তত ১ হাজার ৩৮৬ জন নিহত হয়েছেন। চীনে নিহত হয়েছেন অন্তত ৪৩ জন এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫১৯ জন, যাদের মধ্যে অনেকেই বিদেশী।
নেপালের জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের টানেলে আটকে পড়া কয়েকজনকে উদ্ধারের মতো কিছু বিস্ময়কর ঘটনাও ঘটেছে। তবে উদ্ধার অভিযান নিয়ে নিয়মিত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে এসেছে। আর এই তথ্যের ঘাটতিই অনিশ্চয়তা বাড়ালেও স্বজনদের কেউ কেউ এতে আশার সামান্য আলো দেখছেন।
নরওয়ের বার্গেনে বসবাস করেন ২২ বছর বয়সী ইউক্রেনীয় চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী ভ্লাদিস্লাভা হোরলোভা, তার মা এলেনাও নিখোঁজ। আধ্যাত্মিক ভ্রমণে সীমান্ত এলাকায় যাওয়া ৪২ বছর বয়সী এলেনার সঙ্গে আরো ৪৬ ইউক্রেনীয় নিখোঁজ রয়েছেন।
হোরলোভা বলেন, ‘তাদের মৃত বলে নিশ্চিত করা হয়নি। তাই আমি মনে করি, এটিই ধরে রাখার মতো সামান্য আশা।’
মায়ের কোনো খবরের অপেক্ষায় ফোনের রিংটোন সর্বোচ্চ শব্দে দিয়ে ঘুমাচ্ছেন তিনি। বন্যার একদিন পর মাকে পাঠানো শেষ বার্তাটি ছিল, ‘তুমি কি পৌঁছেছ?’ বার্তাটি এখনো পড়া হয়নি।
অরুশির পরিবারও হাল ছাড়েনি। বন্যার তিন দিন পর তার বাবা ও আরো তিন আত্মীয় কাঠমান্ডু যান। হাসপাতালগুলোয় ঘুরে নিখোঁজ ও নিহতদের তালিকা দেখেন এবং দূতাবাস ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন। পরিচয় শনাক্তে সহায়তার জন্য ডিএনএ নমুনাও দেন তিনি। অরুশি যাত্রার আগে একটি হোটেলে রেখে যাওয়া স্যুটকেসটিও সংগ্রহ করেন।
চীনা ও নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিখোঁজদের সন্ধান এবং পরিবারগুলোকে দ্রুত তথ্য দিতে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। ভারতও জানিয়েছে, তারা চীন ও নেপালের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যায় উপত্যকাগুলোয় ২২ লাখ টন ধ্বংসাবশেষ জমে যাওয়ায় অবকাঠামো ও বসতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা উদ্ধার অভিযানকে কঠিন করে তুলেছে।
নরওয়ে থেকে চীন, নেপাল, নরওয়ে ও ইউক্রেনের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দূতাবাস ও পুলিশ বিভাগে প্রায় ৩০টি ই-মেইল করেছেন ও অনেকবার ফোন করেছেন হোরলোভা। নরওয়ে পুলিশের কাছে ডিএনএ নমুনাও দিয়েছেন। তার মায়ের আইফোনের ‘ফাইন্ড মাই’ অ্যাপে শেষ অবস্থান চীনের অংশে দেখা গেলেও অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডের সর্বশেষ অবস্থান দেখিয়েছে নেপালের অংশে।
অরুশির পরিবারের পাশাপাশি অ্যাপলের কাছেও সহায়তা চেয়েছেন হোরলোভা। অরুশির দলের সদস্যদের স্বজন শচীন যোশিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে মোবাইল অপারেটরদের মাধ্যমে নিখোঁজ স্বজনদের সর্বশেষ অবস্থান খুঁজে বের করার অনুরোধ করেছেন। তবে তিনি বলেন, ‘সত্যি বলতে, কোনো তথ্য নেই—যার সঙ্গেই যোগাযোগ করেন না কেন।’
তারপরও আশা ছাড়েননি অজয় গুপ্ত। স্ত্রী অংশু ও অরুশির স্বামী শুভমকে নিয়ে চলতি সপ্তাহেই আবার নেপাল যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি। তার বিশ্বাস, ‘অলৌকিক ঘটনা ঘটেই থাকে।’
রয়টার্স থেকে সংক্ষেপিত