যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়িয়েছে হুথিরা, ভেঙে পড়ছে ইরানকে কোণঠাসা করে রাখার কৌশলও

আল জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, অতীতেও হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সফলভাবে অবরোধ কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছিল। সে সময় সৌদি আরব ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজের লোহিত সাগর দিয়ে চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়।

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলজুড়ে হুথিদের দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা অনেককেই বিস্মিত করেছে। গত বৃহস্পতিবার লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা আর পরদিন পেরিম দ্বীপ দখল বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সক্ষমতাকে আরো অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে একদিকে আরব উপদ্বীপের দুই পাশেই জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বজায় রেখে সামরিক সংঘাত সীমিত রাখার যে কৌশল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে যাচ্ছে।

আরব উপদ্বীপের অন্য প্রান্তে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি তেল রফতানির বিকল্প পথ হিসেবে সৌদি আরব ক্রমেই লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এখন হুথিদের পেরিম দ্বীপ দখলের মধ্য দিয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ তো অবশ্যই, এমনকি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সমীকরণ একেবারে বদলে গেছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, অতীতেও হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সফলভাবে অবরোধ কার্যকর করতে সক্ষম হয়েছিল। সে সময় সৌদি আরব ও ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজের লোহিত সাগর দিয়ে চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এজন্য হুথিদের প্রণালিটির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ বা সেখানে স্থায়ী উপস্থিতির প্রয়োজন হয়নি। বরং বাব আল-মান্দেব থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থান করেও লোহিত সাগরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করতে পেরেছে তারা।

তবে এবার লোহিত সাগরের উপকূল ও পেরিম দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নেয়ায় হুথিদের সামরিক সক্ষমতা আরো বেড়েছে। দূরের কোনো অবস্থান থেকে হামলার পরিবর্তে উপকূল থেকেই স্বল্পপাল্লার জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘ড্রোন বোট’ ব্যবহার করে শত্রুর জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালাতে পারবে তারা। পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবের উত্তরে অবস্থিত হানিশ দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণেও রয়েছে হুথিরা। এসব দ্বীপ জলপথের গুরুত্বপূর্ণ চেকপয়েন্ট হিসেবে কাজ করে। ফলে লোহিত সাগরে প্রবেশ ও বের হওয়া জাহাজের ওপর তাদের রাডার ও নজরদারি সক্ষমতা আরো বাড়বে। সেই সঙ্গে পূর্ব এশিয়া, ভারত মহাসাগর, আরব সাগর ও এডেন উপসাগর থেকে আসা জাহাজের গতিবিধিও পর্যবেক্ষণ করতে পারবে তারা।

ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, ‘প্রতিপক্ষ যখন হতভম্ব ও মনোবলহীন, তখন অদূরভবিষ্যতে হুথিদের সরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। এখন তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছে এবং তারা নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবে। তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে খরচও অনেক বেশি হবে।’

আল-ওমেইসি আরো বলেন, ‘অবশ্য হুথিরা একা নয়। ইয়েমেনের হুথিরা ইরানের সমর্থন পেয়ে থাকে এবং তথাকথিত “‍অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স”-এর অন্য অংশগুলোর পতনের পর তেহরানের জন্য এ সমর্থন আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই তারা হুথিদের জন্য তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং হুথিদেরও সেই সমর্থন প্রয়োজন।’

এদিকে ইরানের সঙ্গে সপ্তম মাসে গড়ানো যুদ্ধে নতুন সংকটে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে নিজ দেশে জনপ্রিয়তা রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম বেড়ে যাওয়ায় নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার ক্ষেত্রে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাবনাও ঝুঁকিতে পড়েছে।

কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের জ্যেষ্ঠ ফেলো স্টিফেন ওয়ার্থেইম বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ বজায় রেখে সামরিক সংঘাত সীমিত রাখার কৌশল নিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে হুথিদের অগ্রযাত্রা সেই পরিকল্পনাকে ভেঙে দিয়েছে।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরবের শাসক ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলে হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন সামরিক সহায়তা চেয়েছেন। তবে ওয়াশিংটন আপাতত সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানিয়েছে। পরিবর্তে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সৌদি আরবকে সহায়তা করার কথা বলা হয়েছে।

গতকাল ট্রাম্প জানান, তিনি সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের সঙ্গে কথা বলেছেন। হুথিরাও তার প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অংশগ্রহণ না করার অনুরোধ করেছে বলে জানান তিনি।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বলেছে, হুথিদের বিরুদ্ধে অবরোধ বা সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইয়েমেন সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য সংলাপের আহ্বান জানিয়েছে তেহরান।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবর বলছে, হুথিরা বাব আল-মান্দেব বন্ধ করে দিলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে আরো চাপ তৈরি হবে। এতে বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম সরবরাহের প্রায় ৭ শতাংশ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নিকটপ্রাচ্যবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড শেনকার বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হবে ইরানের হাতে একই সঙ্গে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়া। এতে ইরানের হাতে বিপুল প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে।’

বিশ্লেষক ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, এখন ট্রাম্পের সামনে দুটি পথ রয়েছে। হুথিদের পিছু হটাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও সীমিত বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা, অথবা সৌদি আরব ও তার মিত্রদের পাশাপাশি ইয়েমেন সরকারকে হুথিদের মোকাবেলায় একাই ছেড়ে দেয়া।

হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এ ধরনের যুদ্ধে উল্লেখযোগ্য নৌ ও বিমান শক্তি মোতায়েনের পাশাপাশি গোয়েন্দা সম্পদও ব্যবহার করতে হতে পারে। এদিকে গত বছরের তুলনায় হুথিদের অবস্থান পরিবর্তিত হওয়ায় তাদের সামরিক অবস্থান শনাক্ত করতেও নতুন করে গোয়েন্দা তৎপরতা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ও বিমান মোতায়েন করা হলে দেশটির কমে যাওয়া গোলাবারুদ ও বিমান প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টর মজুদের ওপরও চাপ বাড়তে পারে।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মার্কিন সামরিক সম্পদের সংকটের আশঙ্কা নাকচ করে বলেছেন, কমান্ডার-ইন-চিফের সব কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পর্যাপ্ত গোলাবারুদ ও সামরিক মজুদ রয়েছে।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সময়ে ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত টিম লেন্ডারকিং বলেন, ‘হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে যেতে ট্রাম্প অনিচ্ছুক হওয়ায় সৌদি আরবের বিমান অভিযানে আরো গোয়েন্দা সহায়তা দেয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। পাশাপাশি ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তাও বাড়াতে হবে।’

আরও