আল জাজিরা এক্সপ্লেইনার

এআই নিয়ন্ত্রণের আহ্বান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের নীরব স্নায়ুযুদ্ধ

চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস আমোদেইর প্রস্তাবকে ‘স্নায়ু যুদ্ধের কৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটির দাবি, এর উদ্দেশ্য চীনের এআই উন্নয়ন সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখা। চলমান পরিস্থিতিকে তারা ‘নীরব এআই স্নায়ু যুদ্ধ’ বলেও আখ্যা দিয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির উন্নয়ন ধীর করার আহ্বান ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় নতুন বিরোধ তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই শক্তিশালী এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন কিছুটা ধীর করার পাশাপাশি চীনে অত্যাধুনিক এআই চিপ রফতানিতে বিধিনিষেধ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং অভিযোগ করেছে, এআই নিরাপত্তার প্রশ্নকে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন নিজেদের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখতে চাচ্ছে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এক নিবন্ধে আমোদেই বলেন, এআইয়ের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। ফলে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকার ও গবেষকদের আরো সময় দিতে সবচেয়ে উন্নত এআই মডেলের উন্নয়ন ধীর করা প্রয়োজন। তার আশঙ্কা, আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এআই এমন সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যা একটি স্থায়ী বটনেটের মাধ্যমে পুরো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে। এতে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

আমোদেইর সতর্কতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা ও টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তবে আমোদেইর বক্তব্যে এআই নিরাপত্তার পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক উদ্বেগও উঠে এসেছে। তিনি বলেন, চীন এআইয়ে এগিয়ে গেলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এ কারণে চীনে উন্নত এআই চিপ ও চিপ তৈরির সরঞ্জাম সরবরাহে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।

তবে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, এআইয়ে যুক্তরাষ্ট্র চীনের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে এবং এ অবস্থান ধরে রাখা প্রয়োজন। তার ভাষায়, যে এআইয়ে জিতবে, সে-ই জিতবে।

স্থানীয় সময় সোমবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এআই নিয়ে ‘উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কল্যাণমুখী’ অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, বিভিন্ন ধরনের হুমকি তৈরি, সংঘাত এবং ক্ষতিকর প্রতিযোগিতায় জড়ানো এআইয়ের বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে ব্যাহত করবে।

চীনের রাষ্ট্রীয় পত্রিকা গ্লোবাল টাইমস আমোদেইর প্রস্তাবকে ‘স্নায়ু যুদ্ধের কৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। পত্রিকাটির দাবি, এর উদ্দেশ্য চীনের এআই উন্নয়ন সীমিত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিগত আধিপত্য ধরে রাখা। চলমান পরিস্থিতিকে তারা ‘নীরব এআই স্নায়ু যুদ্ধ’ বলেও আখ্যা দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখনো এগিয়ে থাকলেও ব্যবধান কমিয়ে আনছে চীন। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ২০২৬ এআই ইনডেক্স রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো এআই খাতে ২৮৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। চীনের বিনিয়োগ ছিল ১২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

অত্যাধুনিক এআই মডেল প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত সেমিকন্ডাক্টরেও যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা রয়েছে। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক কম উন্নত চিপ ব্যবহার করে কার্যকর এআই মডেল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

গত জানুয়ারিতে চীনা এআই স্টার্টআপ ডিপসিকের নতুন মডেল প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় পতন হয়। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছিল, প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় অনেক কম ব্যয়ে তাদের মডেল তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। ডিপসিকের প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, মডেলটি প্রশিক্ষণে এনভিডিয়ার এইচ৮০০ চিপ ব্যবহার করে ৬ মিলিয়ন ডলারেরও কম কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হয়েছিল।

এ ব্যয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের বড় পার্থক্য রয়েছে। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বরাত দিয়ে ২০২৩ সালে ওয়্যার্ড জানায়, প্রতিষ্ঠানটির জিপিটি-৪ মডেল প্রশিক্ষণে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ হয়েছিল।

এআই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে দুদেশই পরস্পরের বিরুদ্ধে নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরির প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশ সীমিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের যুক্তি, অত্যাধুনিক চিপ চীনের সামরিক, গোয়েন্দা ও নজরদারি সক্ষমতা বাড়াতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসন এনভিডিয়ার ব্ল্যাকওয়েল প্রসেসরসহ সবচেয়ে উন্নত চিপে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখলেও তুলনামূলক কম শক্তিশালী কিছু চিপ চীনে বিক্রির অনুমতি দিয়েছে।

অন্যদিকে এআই সরবরাহ ব্যবস্থার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে চীনের সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত বিরল মৃত্তিকা খনিজের উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ। যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীন দ্বিগুণেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে এআই ডেটা সেন্টার পরিচালনায় প্রয়োজনীয় বিপুল পরিমাণ তুলনামূলক সস্তা বিদ্যুৎ সরবরাহে দেশটি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

এআই ব্যবহারে নিজেদের দায়িত্বশীল অবস্থান তুলে ধরলেও যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয় দেশই জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক কাজে প্রযুক্তিটির ব্যবহার বাড়াচ্ছে।

জুনে ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন গোয়েন্দা কার্যক্রম ও যুদ্ধ পরিচালনায় এআই ব্যবহারের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেয়। মার্চে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণের জন্য উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে লক্ষ্য নির্ধারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মানুষই নিয়েছে বলে দাবি করা হয়।

চীন সামরিক কাজে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা করলেও দেশটির সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষকরা চীনের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন এআই মডেলের ফলাফল ব্যবহার করেছেন বলে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

এদিকে এপি এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এআইসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি চীনের ব্যাপক নজরদারি ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে। ওই ব্যবস্থায় ভিন্নমতাবলম্বী ও বিভিন্ন সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর নজরদারি করা হয়। এতে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এআইয়ের সামরিক ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অবস্থানের সীমাবদ্ধতা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্পষ্ট হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে স্পেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক এআই সম্মেলনে যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের নীতিমালা নিয়ে একটি ঘোষণায় যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায় দুদেশ।

এআই উন্নয়নের গতি কমানোর আহ্বান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এআই নাউ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ভিজিটিং ফেলো আয়া ইব্রাহিম। তার মতে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো একদিকে শক্তিশালী এআই তৈরির জন্য বিপুল আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে, অন্যদিকে নিজেদের তৈরি প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ও সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

এআই উন্নয়নকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখানোর বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছেন তিনি। তার মতে, এ ধরনের প্রতিযোগিতার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত প্রযুক্তি তৈরির দিকে বেশি মনোযোগী হতে পারে এবং এর সম্ভাব্য ক্ষতি ও পরিণতি উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

আয়া ইব্রাহিমের ভাষায়, প্রশ্নটি শুধু কে এআই প্রতিযোগিতায় জিতবে তা নয়; বরং সেই জয়ের জন্য কী মূল্য দিতে হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আরও