সিরিয়ার বাশারের মতো পতন হতে পারে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার

সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে কোণঠাসা মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীতে পক্ষ বদলের মতো বিরল ঘটনাও ঘটছে। দেশটির চার ভাগের মাত্র এক ভাগেরও কম ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জান্তা বাহিনীর হাতে।

সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে কোণঠাসা মিয়ানমার সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীতে পক্ষ বদলের মতো বিরল ঘটনাও ঘটছে। দেশটির চার ভাগের মাত্র এক ভাগেরও কম ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে জান্তা বাহিনীর হাতে। নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতেও ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক’ অবস্থায় রয়েছে সামরিক জান্তা। দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো রাজধানী নেপিদোর দিকে অগ্রসর হতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্রোহীদের ঢেউ রাজধানীর দিকে অগ্রসর হলে সিরিয়ার বাশার আল আসাদের মতো পতন হতে পারে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের বেশির ভাগ জনগণ সামরিক বাহিনীকে ঘৃণা করে। ১৯৬০-এর দশকের শুরুর দিক থেকে মাঝে মাঝে মিয়ানমার শাসন করেছে তারা। যখনই সেনাবাহিনী দেশটির ক্ষমতা নিয়েছে অর্থনীতিকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমানে দেশটির সামরিক বাহিনী পক্ষত্যাগের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। যদিও নিজ জনগণের সঙ্গে আগের সামরিক সংঘর্ষগুলোয় পক্ষত্যাগের ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল ছিল। এমনকি বর্তমানে জান্তা সরকার তার সৈন্যদের জন্য খাবার, অর্থ ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করতেও হিমশিম খাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সিরিয়ার মতো মিয়ানমারের শীর্ষ জান্তা কমান্ডারদের মধ্যেও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে। যদিও এ সংকটের বাইরে রয়েছে জান্তা নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের চারপাশের একটি ছোট গোষ্ঠী। মিন অং হ্লাইং বারবার সিনিয়র কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করছেন, পদ পরিবর্তন করেছেন। তার এমন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে অনেকেই সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অন্ধকারে।

চীন সীমান্তে বিদ্রোহীদের কাছে বেশির ভাগ চেকপোস্টের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সামরিক জান্তা, যা জান্তা বাহিনীর সাপ্লাই চেইনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। সম্প্রতি জান্তা সেনারা মিনডাটের যুদ্ধে হেরেছে। মিনডাট গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শহর। এখানকার নিয়ন্ত্রণ নেয়ায় বিদ্রোহীরা আরো অবাধ চলাচলের সুযোগ পাবে। এছাড়া এ শহরের মাধ্যমে বিদ্রোহীরা সম্ভবত রাজধানীর দিকে দক্ষিণমুখী অগ্রযাত্রার মঞ্চ প্রস্তুত করতে পারে। যদিও জান্তা সেনাবাহিনী এখনো প্রতিদিন মিনডাটে বোমাবর্ষণ করছে, তবে পুনরায় শহরটির দখল নেয়ার মতো পর্যাপ্ত সৈন্য তাদের নেই।

বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ার চেয়ে মিয়ানমারের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সিরিয়ায় বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহী গোষ্ঠী ছিল। কিন্তু মিয়ানমারে বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক বেশি। যাদের মধ্যে অনেকেই অতীতে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। বর্তমানে তারা ঐক্যবদ্ধ। তাদের সম্মিলিত লক্ষ্য জান্তা সরকারের পতন। তবে রাজধানীতে আক্রমণ চালাতে তাদের আরো ব্যাপক প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের প্রয়োজন। এছাড়া সামরিক জান্তার পতনের পর মিয়ানমারের অসংখ্য সশস্ত্র গোষ্ঠী একে অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হবে না—এমন নিশ্চয়তাও নেই। দেশটিতে এমন কোনো ব্যক্তি নেই যিনি এগিয়ে এসে এ পরিস্থিতি এড়াতে সাহায্য করতে পারেন। অং সান সু চি তার প্রেসিডেন্ট পদে থাকা সংক্ষিপ্ত গণতান্ত্রিক যুগে অনেক গোষ্ঠীর বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছেন। তিনি এখন ৭৯ বছর বয়সী, জেলে আছেন। শারীরিকভাবে অসুস্থ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের দিকে বিশেষ মনোযোগ নেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের। যেমনটি তারা সিরিয়ার ক্ষেত্রে দিয়েছিল। শীর্ষস্থানীয় নির্বাসিত মিয়ানমার প্রকাশনা মিজিমা উইকলি সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘সিরিয়ার বিদ্রোহীদের তুলনায় মিয়ানমারে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন অনেক দুর্বল। তারা মিয়ানমার শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও নিন্দা প্রকাশ করলেও জান্তার বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে খুব কম সহায়তা করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সংগঠন আসিয়ান সামরিক জান্তাকে তাদের কথা শুনতে বাধ্য করার ও ভবিষ্যতে সমঝোতার আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।’

যুক্তরাষ্ট্র আগে মিয়ানমারের গণতন্ত্রের শক্তিশালী সমর্থক ছিল। গত এক দশকে তারা গণতান্ত্রিক গোষ্ঠীগুলোকে ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। তবে এখন তারাও ক্রমেই আগ্রহ হারিয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত চলছে। যেগুলো ওয়াশিংটনের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না। এমনকি ২০২৩ সালের বার্মা অ্যাক্ট পাস হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রের এ ‘উদাসীনতার নীতি’ পরিবর্তন হয়নি।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ যেমন থাইল্যান্ড, ভারত এবং বিশেষ করে চীন জান্তা সরকারকে ক্ষমতায় রাখতে চায়। তাদের আশঙ্কা জান্তার পতনে মিয়ানমারে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হবে। যেমনটি ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোমালিয়ায় দেখা গিয়েছিল।

তাদের আরো আশঙ্কা, জান্তার পতন বিশাল এক শরণার্থী স্রোত তৈরি করবে। ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালে অন্তত সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। এ বিশালসংখ্যক শরণার্থী সামাল দেয়ার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি না থাকায় বাংলাদেশ তাদের অস্থায়ী ক্যাম্পে আশ্রয় দেয়, যা রোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অপরাধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বারবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে দিতে ব্যর্থ।

ভারত জান্তা সরকারের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে, অন্যান্য সহায়তাও দিয়েছে। তবে সম্প্রতি তারা বিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নিয়েছে। থাইল্যান্ড জান্তা সরকারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক মঞ্চে তাদের পক্ষে কথা বলেছে। রাশিয়াও সম্প্রতি জান্তা সরকারকে অস্ত্র সরবরাহ করেছে। দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্গঠনের পরিকল্পনাও প্রস্তাব করেছে।

মিয়ানমারের সবচেয়ে বড় অংশীদার চীন মনে করছে সামরিক জান্তা অনেক এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারালেও এখনো তারা এমন সব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে যেগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্যের জন্য জরুরি। চীন মিয়ানমারে তাদের বিশাল বিনিয়োগ নিরাপদ রাখতে চায়। মিয়ানমারে বহু বড় অবকাঠামো ও খনিজ সংক্রান্ত প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে বেইজিং। সামরিক অভ্যুত্থানের পরই সামরিক জান্তাকে সমর্থন দেয় তারা। জান্তা সরকারও ক্ষমতা দখলের পরপরই চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে মিয়ানমারে চুক্তি করতে দেয়। যদিও বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সেগুলো প্রায় বন্ধ।

জান্তা বাহিনী ক্রমেই দেশের বিভিন্ন অংশের নিয়ন্ত্রণ হারানো উদ্বেগ বাড়ছে বেইজিংয়ের। এমনকি চীন তাদের অবস্থানও কিছুটা পরিবর্তন করেছে। যদি সামরিক জান্তা ২০২৫ সালের নির্বাচন করতে পারে তাহলে ১ বিলিয়ন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে এতগুলো আলাদা গোষ্ঠী বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে, সেখানে নির্বাচন হওয়া সম্ভব কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তবে চীন কেবল একটি নির্বাচন চাইছে। যদিও একটি অস্বচ্ছ ও অবিশ্বাস্য নির্বাচন শুধু যুদ্ধের মেয়াদ বাড়াবে, দেশটিকে একটি অচলাবস্থায় ফেলে রাখবে, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল বাশার আল-আসাদের ক্ষেত্রে।

আরও