ইসরায়েলি আগ্রাসনের দুই বছর পরও অনিশ্চয়তায় গাজা

দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাত বন্ধে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রক্তপাত থামানো এবং দুই জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। তবে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় কূটনৈতিক সূক্ষ্মতা ও বাস্তব রূপরেখা সীমিত। সেই ফাঁকগুলো পূরণ করতে গিয়ে আলোচনার টেবিলে যে কোনো সময় নতুন বাধা তৈরি হতে পারে। দক্ষ কূটনীতি ও স্থায়ী রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া, এ শান্তি পরিকল্পনা হয়তো আবারও একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হবে।

ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৪৮ সালে প্রমিজ ল্যান্ড হিসেবে ইসরায়েল সৃষ্টির পরই শুরু হয় যুদ্ধ। সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর যুদ্ধে জড়ায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস ও ইসরায়েলি বাহিনী। আজ গাজা যুদ্ধের দুই বছর পূর্ণ হলো।

সেদিন দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো নৃশংসতার জবাবে ইসরাইলের ভেতরে ঢুকে হামলা চালায় হামাস। এতে প্রাণ হারায় প্রায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি, যাদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক। সে হামলায় ২৫১ জন ইসরায়েলি ও বিদেশী নাগরিককে জিম্মি করে হামাস। ইসরায়েলের হিসাব অনুযায়ী, এখনো প্রায় ২০ জন জিম্মি জীবিত আছেন, আর ২৮ জন মৃত। যাদের মরদেহ ফেরত চায় তেল আবিব।

এরপরই সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে ইসরায়েল। দুই বছরের যুদ্ধে ইসরায়েলি বর্বরতায় গাজা উপত্যকা পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তুপে। হামাস নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে প্রাণ গেছে ৬৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির, যাদের মধ্যে ১৮ হাজারই শিশু। তবে লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট বলছে, হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি।

দুই বছরের এ যুদ্ধে ভয়াবহ খাদ্য সংকট ও দুর্ভিক্ষের মুখে পড়েছে গাজার ২০ লাখেরও বেশি মানুষ। নিরীহ বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্বিচারে চলছে বোমা ও গুলি। গাজায় সব ধরনের মানবিক সহায়তা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পরে তা শিথিল করলেও গাজায় প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য ত্রাণ প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে। আরোপিত অবরোধের কারণে অনেক এলাকা এখন কার্যত কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের মুখে।

দুই বছর ধরে চলা হামলা ও যুদ্ধে হামাসের সামরিক কাঠামোগুলো একরকম ভেঙে পড়েছে। এখন মূলত নগরভিত্তিক গেরিলা বাহিনীতে রূপ নিয়েছে সংগঠনটি। বর্তমান নেতৃত্বে থাকা খালিল আল-হায়া এরই মধ্যে হামাসের প্রশাসনিক ক্ষমতা ত্যাগ করে ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক সরকারের হাতে তুলে দেয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে ভবিষ্যৎ প্রতিশোধ থেকে আত্মরক্ষার জন্য ও প্রয়োজনে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে হামাস কিছু সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে চাইছে।

সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কিছু না বলা হলেও, তাদের অভ্যন্তরীণ লক্ষ্য এখন স্পষ্ট। তারা মূলত—‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স মুভমেন্ট’ হিসেবে নিজেদের পুনর্গঠন করতে চায়।

অন্যদিকে, ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর ভেতরেও যুদ্ধের ক্লান্তি ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক দায়িত্বে থাকা শত-সহস্র রিজার্ভ সৈন্য স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ ইসরায়েলি এখন যুদ্ধবিরতি ও জিম্মিদের মুক্তির পক্ষে।

দুই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটানোর সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি আলোচনার নতুন দরজা খুলেছে। মিশরের শার্ম আল শেখে চলছে পরোক্ষ আলোচনা। সেখানে একপাশে ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল, অন্যপাশে হামাস; মাঝে মধ্যস্থতায় রয়েছে মিশর, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্র। এ আলোচনার মূল ভিত্তি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা ‘গাজা শান্তি পরিকল্পনা’।

ইসরায়েল চায় হামাসের আত্মসমর্পণের শর্তগুলো তারা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। তবে শর্তনির্ধারণের প্রশ্নে এখন সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে হামাস। কারণ গত মাসে দোহায় হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েল বাহিনী। সেসময় হামাস নের্তৃত্বরা ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করছিল। আর তাই বিশ্বমত এমনকি পশ্চিমা সহানুভূতিও এখন হামাসের প্রতিই।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর লক্ষ্য আলাদা। তিনি চান নিজের রাজনৈতিক অবস্থান অটুট রাখতে, দুর্নীতির মামলায় তার বিরুদ্ধে চলমান বিচার বারবার বিলম্বিত করতে এবং আগামী বছরের নির্বাচনে আবারও জয়ী হতে।

পূর্ব ঘোষিত হামাসের ধ্বংস, জিম্মিদের ফেরত, ও গাজার সামরিকীকরণ সম্পূর্ণরূপে শেষ করা এখনো তার প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ লক্ষ্য অর্জনের পথে এখন অনেক অজানা ফাঁদ ও আন্তর্জাতিক চাপ জড়িয়ে গেছে।

এতদিন নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত ছিলেন নেতানিয়াহু। তবে এবার ব্যতিক্রম ঘটেছে। দোহায় বোমা হামলার জন্য কাতারের প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দিয়ে নেতানিয়াহুকে কূটনৈতিকভাবে চাপে ফেলেছেন ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যে তার নতুন কূটনৈতিক রূপরেখা বাস্তবায়নে কাতার অপরিহার্য।

এবারের আলোচনার ভিত্তি হলো ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা ‘গাজা শান্তি পরিকল্পনা’। শার্ম আল শেখে শুরু হওয়া এ আলোচনায় যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা আছে। যা সফল হলে আরব-ইহুদি সংঘাতের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে।

এ আলোচনার প্রথম ও সবচেয়ে কঠিন ধাপ হলো ইসরায়েলি জিম্মিদের বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তির শর্ত নির্ধারণ। বিষয়টি জটিল ও স্পর্শকাতর। তবে এ আলোচনা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার শতবর্ষী ভূমি সংঘাতের অবসান ঘটাবে না। এতে জর্ডান নদী থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান নেই, এমনকি পশ্চিম তীরের ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও কোনো উল্লেখ নেই।

যদিও যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেইসঙ্গে নেতানিয়াহুকে একটি নথিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছেন, যেখানে অস্পষ্টভাবে হলেও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু পরে নেতানিয়াহু সেটি পুরোপুরি উপেক্ষা করে আবারও ঘোষণা করেছেন, ‘ফিলিস্তিনিরা কখনো রাষ্ট্র পাবে না।’ তবুও ট্রাম্পের এ পরিকল্পনায় ইসরায়েলের জন্য অনেক প্রলোভন আছে—বিশেষত হামাসের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার অবসান ও গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণ।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্রুত ফল চান। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে এক বৃহৎ কূটনৈতিক সমঝোতা গড়তে চান। আর এ সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দু ইসরায়েল-সৌদি আরব সম্পর্কের পুনরুদ্ধার। তবে গাজার এ অমানবিক পরিস্থিতির মধ্যে তা সম্ভব নয়। সৌদি আরবও একাধিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্পষ্ট ও অপরিবর্তনীয় পথ ছাড়া কোনো সমঝোতা নয়।

প্রশ্ন উঠছে, হামাস কেন গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা ছাড়াই জিম্মি মুক্তিতে রাজি হচ্ছে? এক্ষেত্রে কাতার হামাসকে আশ্বস্ত করেছে যে ট্রাম্প যদি সমস্ত জিম্মি (জীবিত ও মৃত) ফেরত পায় তাহলে তিনি ইসরায়েলকেও যুদ্ধ শেষ করতে বাধ্য করবেন। যদিও ট্রাম্প এখনো নেতানিয়াহুকে পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছেন। তিনি হামাসকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘যদি তারা চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তবে আমি ইসরায়েলের হামাস ধ্বংস অভিযানে পূর্ণ সমর্থন দেব।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, হামাসের আন্তরিকতা বোঝা যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই। তবে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি চূড়ান্ত করতে আরো অনেক সময় লাগবে। এখনো হাতে শুধু ট্রাম্পের প্রস্তাবিত কাঠামোটি রয়েছে।

দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েল–ফিলিস্তিন সংঘাত বন্ধে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রক্তপাত থামানো এবং দুই জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। তবে ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনায় কূটনৈতিক সূক্ষ্মতা ও বাস্তব রূপরেখা সীমিত। সেই ফাঁকগুলো পূরণ করতে গিয়ে আলোচনার টেবিলে যে কোনো সময় নতুন বাধা তৈরি হতে পারে। দক্ষ কূটনীতি ও স্থায়ী রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া, এ শান্তি পরিকল্পনা হয়তো আবারও একটি অপূর্ণ প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হবে।

আরও