রাশিয়ায় হামলার ক্ষেত্রে কিছু অস্ত্রের গতি কমাতে বাধ্য হয়েছে ইউক্রেন। এসব অস্ত্র পরিচালনায় ব্যবহার হয় স্পেসএক্সের স্টারলিংক ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক। এ নেটওয়ার্কে মার্কিন বিধিনিষেধ আরোপের প্রভাব কমতে পারে ইউক্রেনীয় ড্রোনের গতি, এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন ইলন মাস্ক। খবর বিবিসি।
রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন পরিচালনা এবং নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষায় ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার স্টারলিংক। তবে গত মঙ্গলবার রাতে ইউক্রেন জানায়, অপ্রত্যাশিতভাবে নতুন গতিসীমা আরোপ করায় যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সামরিক অভিযান ব্যাহত হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এক উপদেষ্টা বলেছেন, তার ধারণা, এ বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা কাকতালীয় নয়। কিয়েভ ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপড়েনের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
মাস্ক বলেছেন, স্টারলিংকের সামরিক কাজে ব্যবহারের উপযোগী সহযোগী সেবা স্টারশিল্ড নিয়ন্ত্রণ করে মার্কিন সরকার। এ সেবায় ‘গতিসীমা বা ব্যবহারের ওপর যেকোনো বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট’।
এক্সে দেয়া এক পোস্টে মাস্ক এ কথা বলেন। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা নেটওয়ার্কের সংযোগ পুনরায় চালুর অনুরোধ জানিয়ে আসছিলেন। তাদের মধ্যে জেলেনস্কিও ছিলেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি, এটি কোনো ভুল, হয়তো বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা। আমি জানি না। তবে আমরা সংযোগটি আবার চালু করার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের স্টারলিংক মঙ্গলবার রাতে গতিসীমা ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা ১৬০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনে। এর ফলে এর চেয়ে বেশি গতিতে চলাচলকারী যেকোনো আকাশ প্রতিরক্ষা অস্ত্র নেটওয়ার্কটির সংযোগ হারায়।
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ গতকাল সন্ধ্যায় জানান, নেটওয়ার্কটির সংযোগ আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
এক এক্স পোস্টে তিনি লেখেন, ‘স্টারশিল্ডের গতিসীমা পুরোপুরি তুলে নেয়া এখন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
এ সময় ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি ইলন মাস্কের ‘অব্যাহত সমর্থন’ কামনা করেন তিনি।
প্রায় এক ঘণ্টা পর ওই পোস্টের জবাব দেন মাস্ক। এতে নিজের প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার পক্ষে বক্তব্য দেন।
মাস্ক লেখেন, ‘স্টারশিল্ড ব্যবস্থার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ মার্কিন সরকারের হাতে। গতিসীমা বা ব্যবহারের ওপর যেকোনো বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট।’
মাস্ক আরো বলেন, স্টারলিংক ‘বেসামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের’ জন্য। আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে এটি ব্যবহার করা যায় না। কারণ, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এমন ব্যবহার অনুচিত হবে।
এ বিষয়ে মার্কিন সরকার কোনো মন্তব্য করেনি।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড—দুটি সেবাই মাস্কের স্পেসএক্সের মালিকানাধীন। তবে স্টারলিংক একটি বেসামরিক সেবা, যা নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ সেবা গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, সরকারি ও সামরিক ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়েছে স্টারশিল্ড।
মঙ্গলবার রাতে এ বিধিনিষেধ আরোপের সময় ইউক্রেনে প্রাণঘাতী হামলা চালায় রাশিয়া। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, এসব হামলায় কিয়েভে বেশ কয়েকজন নিহত হন। পাশাপাশি ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী ব্যবহার করে এমন যোগাযোগ ও জ্বালানি স্থাপনাও হামলার শিকার হয়।
জেলেনস্কি এ হামলাকে রাশিয়ার চালানো ‘সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে’, তবে কিছু ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
এ ঘটনায় ইউক্রেনজুড়ে অন্তত ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ড্রোন আঘাত হানার আগে তারা আসন্ন হামলার বিষয়ে কোনো সতর্কবার্তা পাননি।
গতকাল সকালে টেলিগ্রামে জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি বেসক্রেস্তনভ লেখেন, ‘এটি স্পষ্ট যে, এ পদক্ষেপ কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না। এর সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে।’
রুশ জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের অব্যাহত হামলায় দেশটির ওপর ক্রমেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
জেলেনস্কি বলেছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত জ্বালানি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত না হলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল। তবে মঙ্গলবার ট্রাম্প এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।
লন্ডন সফরকালে গতকাল জেলেনস্কি স্বীকার করেন, রাশিয়ার কাছ থেকে ৩ লাখ টন ডিজেল আমদানির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করায় তিনি বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছেন বলে মনে করছেন।