বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন রাজতন্ত্র হিসেবে পরিচিত জাপানের ‘ক্রিস্যান্থেমাম থ্রোন’ বা চন্দ্রমল্লিকা সিংহাসন। রাজপরিবারের ভূমিকা আনুষ্ঠানিক হলেও দেশটির ১২ কোটি ৩০ লাখ মানুষের কাছে এটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। জাপানি পুরাণে সম্রাটদের সূর্যদেবীর বংশধর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সম্রাট নারুহিতো ও সম্রাজ্ঞী মাসাকোর সঙ্গে দাঁড়িয়ে জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এ রাজতন্ত্র বর্তমানে চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। তবে তা কোনবহিঃশত্রু বা রাজনৈতিক বিপ্লব নয়, বরং নিজস্ব ‘উত্তরাধিকার নীতি’। কেবল পুরুষ উত্তরাধিকারীদেরই সিংহাসনে বসার সুযোগ দেয়ার যে কঠোর নিয়ম, তা-ই এখন রাজবংশটিকে বিলুপ্তির খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে।
সাম্প্রতিক দশকগুলোয় রাজপরিবারে ছেলের তুলনায় কন্যাসন্তানের জন্ম বেশি হওয়ায় উত্তরাধিকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বর্তমানে জাপানের সম্রাট হওয়ার আইনি যোগ্যতা রয়েছে মাত্র তিনজনের, যার মধ্যে দুজনের বয়সই ৬০ বছরের বেশি। এ সংকট মোকাবিলায় জাপানি নীতিনির্ধারকেরা যখন নানা বিকল্প ভাবছেন, তখন একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে সামনে আসছে—ইতিহাস ও আধুনিকতার সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও জাপানের রাজপরিবারে নারী সম্রাটের পথ বন্ধ কেন?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে জাপানি রাজপরিবারের কাঠামো ছিল বেশ বিস্তৃত। মূল রাজবংশের পাশাপাশি ‘ওকে’ নামে পরিচিত বেশ কয়েকটি পার্শ্বশাখা ছিল রাজপরিবারের অংশ। মূল বংশে কোনো পুরুষ উত্তরাধিকারী না থাকলে পার্শ্বশাখাগুলো থেকে সম্রাট নির্বাচন করার সুযোগ ছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর দৃশ্যপট বদলে যায়।
যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানের অর্থনীতি পুনর্গঠন ও রাজকীয় ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে তৎকালীন মার্কিন সেনাপ্রধান জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের তত্ত্বাবধানে রাজপরিবারের আকার ছোট করে ‘ইম্পেরিয়াল হাউস ল’ সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইনের আওতায় তৎকালীন সম্রাট হিরোহিতোর নিকটাত্মীয়দের বাইরে বাকি ১১টি পার্শ্বশাখা বিলুপ্ত করে দেয়া হয়। এক রাতের ব্যবধানে রাজপরিবারের ৫১ জন সদস্য সাধারণ নাগরিকে পরিণত হন। ফলে ৬৭ সদস্যের রাজপরিবার সংকুচিত হয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১৬ জনে।
১৯৪৭ সালের ২৮ অক্টোবর নতুন সংবিধান কার্যকরের ফলে টোকিওর আকাসাকা প্রাসাদে বিদায়ী সংবর্ধনা ও চা-চক্র শেষে রাজপরিবারের ৫১ সদস্য সাধারণ নাগরিকের মর্যাদা গ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানের পর তাদের একাংশ প্রাসাদের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে।
একইসঙ্গে নিয়ম করা হয়, রাজপরিবারের কোনো নারী সদস্য যদি সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করেন, তবে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজকীয় মর্যাদা হারাবেন এবং রাজপরিবার থেকে বিচ্যুত হবেন। যদিও রাজপরিবারের ক্রমাগত সংকোচনের কারণে সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করাই রাজকুমারীদের জন্য অনিবার্য বাস্তবতা।
বর্তমানে জাপানের রাজপরিবারে উত্তরাধিকারের তালিকায় রয়েছেন মাত্র তিনজন সদস্য। বর্তমান সম্রাট নারুহিতোর বয়স ৬৬ বছর। তার একমাত্র সন্তান জনপ্রিয় রাজকুমারী আইকো। কিন্তু নারী হওয়ায় তিনি আইনগতভাবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী নন। ২৪ বছর বয়সী আইকোর ভবিষ্যতে ছেলে সন্তান হলেও সেও সম্রাট হওয়ার অধিকার পাবে না।
বর্তমানে উত্তরাধিকার তালিকায় রয়েছেন সম্রাটের ৯০ বছর বয়সী চাচা প্রিন্স হিতাচি, ৬০ বছর বয়সী ছোট ভাই ক্রাউন প্রিন্স আকিশিনো এবং আকিশিনোর ১৯ বছর বয়সী ছেলে প্রিন্স হিসাহিতো। গত ৪০ বছরে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া প্রথম পুরুষ রাজপরিবারের সদস্য হিসাহিতোই সবচেয়ে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী। পুরো রাজবংশের ভবিষ্যৎ এখন কার্যত এ এক কিশোরের কাঁধেই নির্ভর করছে।
প্রিন্স হিসাহিতো, ১৯ বছর বয়সী এ কিশোর-ই চন্দ্রমল্লিকা বংশের সম্ভাব্য উত্তরসূরী
সম্রাট হিসেবে একজন নারীকে মেনে নিতে জাপানের সাধারণ জনগণ প্রস্তুত। বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ জাপানি নাগরিক নারী সম্রাটের ধারণার প্রতি ইতিবাচক। লিঙ্গসমতার যুগে সম্রাটের পদটি পুরুষের জন্য কঠোরভাবে সংরক্ষিত রাখাকে নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা। তবুও কেন আটকে আছে এ সংস্কার?
দেশটির রক্ষণশীল নীতিনির্ধারকদের মতে, পুরুষানুক্রমিক বা পিতৃসূত্রের উত্তরাধিকারই জাপানি রাজতন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতার মূল ভিত্তি। তাদের মতে, ঐতিহ্যগত পিতৃসূত্রের উত্তরাধিকার বজায় রাখা জরুরি। জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে এত গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য পরিবর্তন করলে রাজতন্ত্রের সম্মান নষ্ট হতে পারে।
এ মতের কট্টর সমর্থক ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)-র প্রভাবশালী নেতা ও প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিও। তার মতে, সম্রাট হওয়ার যোগ্যতা কেবল রাজবংশের পুরুষ উত্তরসূরিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাই উপযুক্ত।
অন্যদিকে, গবেষক ও উদারপন্থীদের মতে, নারীকে সিংহাসন থেকে দূরে রাখা জাপানের কোনো চিরন্তন ঐতিহ্য নয়। টোকিওর চুও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক মাকোতো ওকাওয়া জানান, জাপানের ইতিহাসে অন্তত আটজন নারী সম্রাট ছিলেন। মূলত ১৮৮৯ সালে মেইজি যুগে প্রণীত ‘ইম্পেরিয়াল হাউস আইন’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে নারী সম্রাটের পথ বন্ধ করা হয়।
পরিবারের সঙ্গে প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সম্রাট নারুহিতো
উত্তরাধিকার সংকট কাটাতে বর্তমান সরকার একটি নতুন সংশোধনী বিল এনেছে। তবে এ প্রস্তাবিত বিলটিতেও কোনো রাজকন্যার সিংহাসনে আরোহণের সুযোগ রাখা হয়নি। সরকারের প্রস্তাবগুলো হলো: বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া পার্শ্বশাখার ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী, অবিবাহিত ও নিঃসন্তান পুরুষ সদস্যদের রাজপরিবারে ‘দত্তক’ হিসেবে নেয়া হবে, যাতে তাদের ভবিষ্যৎ সন্তানরা সিংহাসনের দাবিদার হতে পারে।
রাজকন্যারা সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করলেও রাজপরিবারে থেকে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে তাদের পুত্রসন্তানদের জন্য সিংহাসনের দরজা বন্ধই থাকবে।
অধ্যাপক ওকাওয়ার মতে, এ ব্যবস্থাগুলো কেবলই সাময়িক সমাধান। পুরো ব্যবস্থাটি যদি মাত্র একজন বা দুজন পুরুষ উত্তরাধিকারীর ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়, তবে রাজতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অসম্ভব।
সিএনএন অবলম্বনে