পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘চানক্য’ অমিত শাহ?

বিশ্লেষকদের মতে, এ জয় শুধু একটি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়। বরং পূর্ব ভারতে বিজেপির প্রভাব বিস্তারের একটি বড় মাইলফলক। বিহার, বাংলা ও ওড়িশা—এই ‘অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ’ অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করল দলটি

মমতা ব্যানার্জিকে লক্ষ্য করে গত মাসের শেষ দিকে পশ্চিম মেদিনীপুরের এক জনসভায় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছিলেন, ‘চন্ডিপুর থেকে আমি দিদিকে বলতে চায়, টাটা বাই বাই। আপনার সময় শেষ! বাংলার মানুষকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন। এখন আপনার বিদায় নেয়ার ও বিজেপির প্রবেশের সময়।’

এর কয়েক সপ্তাহ পর গতকাল ঘোষিত বিধানসভা নির্বাচনের ফলে অমিত শাহর সেই বক্তব্য যেন বাস্তবে রূপ নিল। পশ্চিমবঙ্গ ২৯৪টির মধ্যে ২০৬টি আসন জিতে এক ঐতিহাসিক জয় পায় বিজেপি। অন্যদিকে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেস পায় মাত্র ৮১টি আসন। এ জয়ের মধ্য দিয়ে বিজেপি প্রথমবারের মতো রাজ্যে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এবং ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়েছে।

এ ফলাফলের নাটকীয়তা বাড়িয়েছে ভবানীপুরে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাচে মমতা ব্যানার্জির পরাজয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এ জয় শুধু একটি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়। বরং পূর্ব ভারতে বিজেপির প্রভাব বিস্তারের একটি বড় মাইলফলক। বিহার, বাংলা ও ওড়িশা—এই ‘অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ’ অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করল দলটি।

বিজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুটেছে’ এবং রাজ্যের মানুষের প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি দেন।

তবে এই সাফল্য রাতারাতি আসেনি। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ভোট হিস্যা ছিল প্রায় ৪ শতাংশ, সেখান থেকে ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪০ শতাংশে। ২০২১ সালের নির্বাচনে ৭৭টি আসন জিতে তারা প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই ভিত্তিকে ক্ষমতায় রূপ দিতে এতদিন সফল হয়নি—যা এবার সম্ভব হয়েছে।

এ সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন অমিত শাহ, যাকে অনেকেই বিজেপির ‘চাণক্য’ বলে থাকেন। জানুয়ারি থেকেই তিনি সংগঠনকে তৃণমূল স্তরে শক্তিশালী করার কাজ শুরু করেন। একাধিক রাতভর বৈঠক, বুথভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং রাজ্যজুড়ে বিস্তৃত সফরের মাধ্যমে তিনি দলীয় কর্মীদের উজ্জীবিত করেন। বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তিনি প্রায় ৬৬টি জনসভা ও রোডশো করেছেন।

অমিত শাহর প্রচারে ছিল সুস্পষ্ট বার্তা ও প্রতিশ্রুতি। তিনি সরকারী কর্মচারীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন বাস্তবায়নের কথা বলেন, আইন-শৃঙ্খলা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেন। পাশাপাশি তিনি ঘোষণা করেন, ৪৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্ত সিল করা হবে। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘কাটমানি’ ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতির অভিযোগ তোলেন এবং নারী নিরাপত্তা ও দুর্নীতির বিষয়গুলোকে জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

তিনি নারীদের জন্য মাসিক ৩ হাজার রুপি সহায়তা, সরকারী চাকরিতে ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ, চা-বাগানের শ্রমিকদের জমির অধিকারসহ নানা কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতি দেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এবারের প্রচারে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে বিরত থেকে মূলত দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নেই জোর দেন—যা ২০২১ সালের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়।

এ বিজয় যদিও অনেকাংশে অমিত শাহর নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছে, তবুও এটি ছিল একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা। তার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছেন আরো পাঁচ নেতা—ধর্মেন্দ্র প্রধান, ভুপেন্দর যাদব, সুনীল বানসাল, বিপ্লব দেব ও অমিত মালভিয়া। কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় করেন ধর্মেন্দ্র, তৃণমূল স্তরে সংগঠন শক্তিশালী করেন ভূপেন্দ্র। বুথভিত্তিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন সুনীল। অন্যদিকে কর্মীদের সক্রিয় করেন বিপ্লব এবং অনলাইনে প্রচারযুদ্ধ পরিচালনা করেন অমিত মালব্য।

ফার্স্টপোস্টের এক্সপ্লেইনার থেকে সংক্ষেপিত

আরও