ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন কোনো জোটই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার অবস্থানে নেই। ফলে নতুন সরকার গঠনে আরব দলগুলো নির্ধারক ভূমিকা রাখতে পারে। খবর বিবিসি।
এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ সবচেয়ে বড় একক দল হিসেবে উঠে এসেছে। তবে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও কট্টর অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট করেও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে তার শিবির। অন্যদিকে সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরও এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন পাবে বলে মনে হচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এখন পর্যন্ত গণনা করা ভোটে ডানপন্থী দলগুলোর শক্তিশালী এলাকাগুলোর ভোট বেশি সামনে এসেছে। ফলে চূড়ান্ত ফলাফলে পরিবর্তন আসতে পারে। ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৬১টি আসন। নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ শতাংশের বেশি।
ইসরায়েলের খণ্ডিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলকে জোট করতে হয়। প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, আইজেনকটের বিরোধী শিবির আরব-অধ্যুষিত দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সমস্যায় পড়তে পারে। আংশিক ফলাফলে আরব দলগুলো আগের নির্বাচনে পাওয়া আসনসংখ্যা ধরে রেখেছে কিংবা তা ছাড়িয়ে গেছে।
নির্বাচনী প্রচারে ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধী দলগুলোর অধিকাংশই আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তাদের যুক্তি ছিল, দুই পক্ষের মূল্যবোধে মিল নেই। তবে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক সমীকরণ বদলালে আরব দলগুলোই সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে।
ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব। তাদের অনেকে নিজেদের ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। এবারের নির্বাচনে আরব ভোটারদের নজিরবিহীন উপস্থিতি দেখা গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের অনেকে নির্বাচনকে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ইতিহাসের সবচেয়ে ডানপন্থী সরকারকে পরাজিত করার গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে দেখেছেন। তাদের অভিযোগ, সরকার বর্ণবাদ ও বিদ্বেষ উসকে দিয়েছে।
তবে এখনো গণনা না হওয়া বিপুলসংখ্যক অনুপস্থিত ভোটের কারণে চূড়ান্ত ফল জানতে আরও এক-দুই দিন লাগতে পারে। এসব ভোটের বড় অংশই ইসরায়েলি সেনাসদস্যদের।
রাতেই সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন নেতানিয়াহু ও আইজেনকট। দুজনই পরবর্তী সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেছেন।
নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইহুদি রাষ্ট্রকে সমর্থনকারী জনগণ, ইহুদি জনগোষ্ঠী এবং জায়নবাদী জনগণের মধ্যে ডানপন্থী শিবিরের স্পষ্ট ও নির্ণায়ক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।’
অন্যদিকে প্রাথমিকভাবে বিরোধীদের অনুকূলে থাকা বুথফেরত জরিপ প্রকাশের পর নিজের ইয়াশার পার্টির সমর্থকদের আইজেনকট জানান, অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে জনগণের রায়কে একটি স্থিতিশীল জায়নবাদী সরকারে রূপ দিতে কাজ করবেন। এমন সরকার ইসরায়েলের সব নাগরিকের জন্য ভালো হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে গভীর বিভাজন
সাম্প্রতিক নির্বাচন দেশটির সমাজে দীর্ঘদিনের বিভাজনকে আরো স্পষ্ট করেছে। নির্বাচনটি শুধু নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ওপর গণভোট ছিল না; বরং ইসরায়েল কেমন রাষ্ট্র হবে, সেই প্রশ্নেও ভোট দিয়েছেন নাগরিকরা। নেতানিয়াহু দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি, যদিও তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
গত চার বছরে নেতানিয়াহু ও তার জোটসঙ্গীরা দেশকে ইসরায়েলকে আরো কট্টর ধর্মীয় ও জাতীয়তাবাদী পথে নিয়ে গেছেন। বিচারব্যবস্থায় সংস্কারের পরিকল্পনা ঘিরে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলার আগেই দেশটিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। ওই হামলার পর গাজা, লেবানন ও ইরানে একের পর এক যুদ্ধ শুরু হয়। অন্যদিকে অনেক ইসরায়েলি দেশটিকে আরো উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত দেখতে চান।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের জরিপ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তামার হারমান নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, নেতানিয়াহুপন্থী ও নেতানিয়াহুবিরোধী দুই শিবিরের আপেক্ষিক জনসমর্থনে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। তার ভাষায়, ৭ অক্টোবরের পর অনেকে আশা করেছিলেন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান পুরোপুরি ভেঙে পড়বে, এমনকি তিনি ক্ষমতাচ্যুত হবেন। কিন্তু তা ঘটেনি।
নির্বাচনের পরপরই দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের আলোচনা শুরু হয়েছে। ইসরায়েলি সাংবাদিক ও লেখক ইয়াকভ কাটজের মতে, উভয় পক্ষই অন্য শিবির থেকে আইনপ্রণেতাদের নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করবে। এমনকি সংখ্যালঘু সরকার গঠনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ সফল না হলে সরকার গঠনে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে।
সাধারণত বড় দলগুলো ছোট দলকে মন্ত্রিসভায় পদ, বাজেট বরাদ্দ কিংবা নির্দিষ্ট নীতি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জোটে টানার চেষ্টা করে। এখন দেখার বিষয়, বিরোধী শিবিরের নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ভাঙতে প্রস্তুত কিনা।
বিরোধী জোটের অন্যতম নেতা ডানপন্থী রাজনীতিক আভিগদোর লিবারম্যান নির্বাচনী প্রচারে বলেছিলেন, আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল সংখ্যালঘু সরকারে তিনি যোগ দেবেন না। ৭ অক্টোবরের হামলার পর আরব নাগরিকদের প্রতি অবিশ্বাস ও বৈরিতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
অন্যদিকে আরব দল রা’আমের প্রধান মানসুর আব্বাস জানিয়েছেন, তিনি পরবর্তী সরকারে অংশ নিতে চান। ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নেতানিয়াহুকে ক্ষমতার বাইরে রাখা বৈচিত্র্যপূর্ণ জোটে তার দল অংশ নিয়েছিল। এবারও নির্বাচনের পর সম্ভাব্য জোটসঙ্গীরা আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় বেশি আগ্রহী হবে বলে তিনি আশা করছেন।
আব্বাস বলেন, ‘নির্বাচনের আগে ইসরায়েলের সব রাজনীতিক এক কথা বলেন, আর নির্বাচনের পরে তাদের ভাষা বদলে যায়। আমরা আগেও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। তাই এতে আমরা উদ্বিগ্ন নই।’
এদিকে নেতানিয়াহু ও তার মিত্ররা আরব দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে প্রচার শুরু করেছেন। তাদের বক্তব্যে আরব নাগরিকদের দেশের অভ্যন্তরীণ হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
সরকার গঠনের পরবর্তী ধাপ
চূড়ান্ত ফলাফল আগামী সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে জমা দেয়া হবে। এর পর তিনি নির্বাচিত দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে যার সরকার গঠনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, তাকে দায়িত্ব দেবেন।
নির্বাচিত প্রার্থী সর্বোচ্চ ছয় সপ্তাহের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে অন্য কাউকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়া হতে পারে। শেষ পর্যন্ত কোনো দল বা জোট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া আবার শুরু হবে।
এসময় পর্যন্ত নেতানিয়াহুর সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। তবে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনার ক্ষমতা তাদের থাকবে না।