ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কে নতুন যুগের আহ্বান চীনের

তাইওয়ান প্রশ্নে কড়া বার্তা

ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের ‘নতুন যুগের’ আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। একই সঙ্গে তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে পরিচালিত হলে দুই দেশের সম্পর্ক বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে যেতে পারে বলেও কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।

গতকাল বেইজিংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ হুঁশিয়ারি দেন শি। বৈঠকে শি জিনপিং ‘গঠনমূলক কৌশলগত ও স্থিতিশীল সম্পর্ক’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। এছাড়া দুই নেতা হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা, বাণিজ্য আলোচনা এগিয়ে নেয়া এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো, তাইওয়ান, ইরান যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিসহ বিস্তৃত বিষয়ে আলোচনা করেছেন। একই সঙ্গে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি আমদানির বিষয়েও অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আগামী তিন বছর ও তার পরবর্তী সময়ের জন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন দিকনির্দেশনা হিসেবে গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীল সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়েছে দুই দেশ। বৈঠকে শি জিনপিং বলেন, ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা এমন হওয়া উচিত, যার প্রধান ভিত্তি হবে সহযোগিতা।’ বাণিজ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ, সামরিক বাহিনীগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্য, কৃষি, পর্যটন, জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ ও আইন প্রয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন চীনা প্রেসিডেন্ট।

এছাড়া তাইওয়ান ইস্যু ভুলভাবে পরিচালনা করা হলে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক বিপজ্জনক পথে যেতে পারে, এমনকি দুই দেশের মধ্যে সংঘাতও সৃষ্টি হতে পারে বলেও ট্রাম্পকে সতর্ক করেছেন শি জিনপিং। তিনি বলেন, ‘তাইওয়ান ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। এটি ভুলভাবে সামলানো হলে পুরো যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পড়ে যেতে পারে এবং দুই দেশ সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।’

আলোচনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশিত সারসংক্ষেপে তাইওয়ান প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়নি। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এনবিসি নিউজকে নিশ্চিত করেছেন বৈঠকে বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘চীনারা সবসময়ই তাদের পক্ষ থেকে বিষয়টি তোলে, আমরাও আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করি, তারপর অন্য বিষয়ে এগিয়ে যাই।’

চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে। তবে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত দ্বীপটি কার্যত স্বশাসিত। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও আইন অনুযায়ী তাইওয়ানকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা জোরদারে সহায়তা দিয়ে থাকে। বর্তমানে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি মার্কিন অস্ত্র বিক্রয় প্যাকেজ ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চীন এরই মধ্যে এ অস্ত্র বিক্রির তীব্র বিরোধিতা করেছে।

গতকাল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক টেম্পল অব হেভেনে দুই নেতা একসঙ্গে ছবি তোলেন। সেখানে সাংবাদিকরা তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে প্রশ্ন করলেও ট্রাম্প কোনো মন্তব্য করেননি। তাইওয়ান ছাড়াও বৈঠকে ইরান যুদ্ধ, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, হরমুজ প্রণালি এবং বাণিজ্য সম্পর্কের বিষয় গুরুত্ব পায়। যুক্তরাষ্ট্রের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, দুই নেতা ইরান যুদ্ধের কারণে কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালিকে আবার চালু করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন। একই সঙ্গে চীন মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে বলেও জানানো হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরান ইস্যুতে আলোচনা হলেও চীনের সহায়তা চাননি ট্রাম্প। তিনি ফক্স নিউজকে বলেন, ‘সংকট সমাধানে সহায়তা করা চীনেরও স্বার্থে রয়েছে। কারণ তাদের অনেক জাহাজ উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে আছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীর হয়ে গেলে চীনের রফতানিকারকরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ রুবিও বলেন, ‘চীন জানিয়েছে তারা হরমুজ প্রণালিকে সামরিকীকরণের পক্ষে নয় এবং সেখানে কোনো টোল ব্যবস্থা চালুর পক্ষেও নয়। এটিই আমাদের অবস্থান। এ বিষয়ে অন্তত আমাদের মধ্যে একধরনের সমঝোতা রয়েছে, যা ইতিবাচক।’

বৈঠকে ট্রাম্প শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই হবে শির প্রথম ওয়াশিংটন সফর। বেইজিং সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিক মার্কিন করপোরেটপ্রধানও রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন টেসলা প্রধান ইলোন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র এনভিডিয়ার শক্তিশালী এইচ২০০ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ কেনার জন্য প্রায় ১০টি চীনা প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দিয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত কোনো চালান সরবরাহ করা হয়নি।

এছাড়া গতকাল ট্রাম্পের সম্মানে দেয়া রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে শি জিনপিং বলেন, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কই বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আমাদের এটিকে কার্যকর করতে হবে এবং কখনই নষ্ট হতে দেয়া যাবে না।’ নৈশভোজে লবস্টার স্যুপ, বেইজিং রোস্ট ডাক ও তিরামিসুসহ ১০ পদ পরিবেশন করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির মধ্যে সম্পর্ক গত কয়েক বছরে ব্যাপক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া বাণিজ্যযুদ্ধ তার দ্বিতীয় মেয়াদে আরো গভীর হয়েছে। শুল্ক আরোপ, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, তাইওয়ান ইস্যু এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে প্রতিযোগিতা দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ে ট্রাম্প-শি বৈঠক এবং পরবর্তী নৈশভোজে দেয়া বক্তব্যকে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দুই নেতা আজ আবার একসঙ্গে চা ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন। এরপরই ট্রাম্পের বেইজিং ত্যাগ করার কথা রয়েছে। সিএনএন ও রয়টার্স।

আরও