২০২৪ সালের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। সারা দেশে খুন, গণপিটুনি, মব সহিংসতা, অপহরণ, দখল এবং চাঁদাবাজির মতো অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকায় অন্তত সাতটি বড় ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যেগুলো সমাপ্ত হয়েছে কোনো ধরনের সহিংসতা বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়া এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে। লক্ষাধিক লোকের সমাগম হলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আয়োজকদের তৎপরতায় কোনো বিশৃঙ্খলার ছাপ এ ধরনের কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকলে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন সম্ভব—এটা তারই প্রমাণ।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ৭ আগস্ট থেকে এ বছরের ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় অন্তত সাতটি বড় সমাবেশ হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজধানীতে প্রথম সমাবেশ করে বিএনপি। নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সে সমাবেশে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সাত বছর পর এ সমাবেশের মধ্য দিয়ে জনসম্মুখে আসেন খালেদা জিয়া। ভঙ্গুর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে কয়েক লাখ নেতাকর্মীর সমাগমে এমন সমাবেশ আয়োজন নিয়ে বিশৃঙ্খলার শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেনি। এরপর গত ১২ এপ্রিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মার্চ ফর গাজা কর্মসূচির আয়োজন করে প্যালেস্টাইন সলিডারিটি মুভমেন্ট নামের একটি সংগঠন। যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে দলমত নির্বিশেষে কয়েক লাখ মানুষ অংশ নেয়। এরপর গত ২৮ মে রাজধানীর নয়াপল্টনে যুব শোভাযাত্রার আয়োজন করে বিএনপি। যুব অধিকারের দাবিতে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন দলটির লক্ষাধিক নেতাকর্মী। এ কর্মসূচিও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। এছাড়া চলতি বছরের ১৯ জুলাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় সমাবেশ আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ। দলের নেতাকর্মীদের নামে থাকা মামলা প্রত্যাহার এবং সাংবিধানিক সংস্কারের দাবিতে আয়োজিত ওই সমাবেশে দলের বিভিন্ন স্তরের লক্ষাধিক নেতাকর্মী অংশ নেন। জামায়াতের ওই সমাবেশ শেষ হয় কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছাড়াই।
এরপর গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে জাতীয় নাগরিক কমিটি (এনসিপি)। এ উপলক্ষে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে সমাবেশ করে দলটি। এ সমাবেশ ঘিরেও কোনো বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি। তবে জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের জুলাই যোদ্ধা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও কিছু সময় পরই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভঙ্গুর অবস্থায় থাকলেও এ সময়ের মধ্যে আমরা বেশ কয়েকটি বড় ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হতে দেখেছি। এসব সমাবেশ ঘিরে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলতার শঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই কর্মসূচিগুলো শেষ হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ করার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় কাজ করে। প্রথমত, সরকারের সদিচ্ছা, দ্বিতীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর ভূমিকা ও তৃতীয়ত, আয়োজক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে রাজনৈতিক শিষ্টাচার এবং সিনিয়র নেতৃত্বের নির্দেশনা মেনে চলার মানসিকতা। শেষ কয়েকটি সমাবেশে আমরা লক্ষ করেছি, শিষ্টাচারের একটি সংস্কৃতি রাজনৈতিক দল ও নেতাকর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এ শিষ্টাচার ও সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন আয়োজন সম্ভব।’
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর সার্বিকভাবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ থাকলেও ঢাকায় অনুষ্ঠিত বড় সমাবেশগুলো সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এটি সম্ভব হয়েছে পূর্বপ্রস্তুতি, গোয়েন্দা নজরদারি, পর্যাপ্ত ফোর্স মোতায়েন ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে। বাংলাদেশ পুলিশ ভবিষ্যতেও যেকোনো বড় জনসমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজন নিশ্চিত করতে সক্ষম ও প্রস্তুত।’